অপরাধ
নির্বাচনের আঁচ আন্ডারওয়ার্ল্ডে
আজিজুর রহমান জিদনী
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৩৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নানা ঘটনায় সহিংসতা বাড়ছে। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই পক্ষের বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনায় সাদ্দাম হোসেন (৩২) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এরই মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাও বাইরে রয়েছেন। সম্প্রতি চট্টগ্রামে ভোটারদের সঙ্গে এক প্রার্থীর জনসংযোগের সময় গুলিতে নিহত হন অপরাধজগতের প্রভাবশালী খেলোয়াড় সারওয়ার হোসেন বাবলা।
চট্টগ্রামের রাউজানে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম ও যুবদল কর্মী মোহাম্মদ আলমগীরকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। পুরান ঢাকায় একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়; যিনি জামিনে বের হয়েছিলেন। পল্লবীতে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনায় মিরপুরকেন্দ্রিক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গড়া ফোর স্টার গ্রুপের নাম আসে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা নির্বাচনের আগে ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কি সক্রিয় হয়ে উঠছে? যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, যে কোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা সোচ্চার। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটলেই দোষীরা আইনের আওতায় আসছে। তবে কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা কেন রোধ করা যাচ্ছে না, বিষয়টি গোয়েন্দা ব্যার্থতা কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ক্ষমতার অংশ হতে একটা অংশ মরিয়া হয়ে রয়েছে। এর আগেও অনেক নির্বাচনে পেশিশক্তি হিসেবে বা ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টিতে চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনীর ব্যবহার হতে দেখা গেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর অনেকেই জামিনে এখন বাইরে। এদের মধ্যে সমাজের অস্থিরতার জন্য দায়ী হতে পারেন এমন অনেকের জামিন হয়েছে। তাদের অবস্থা বিবেচনায় সমাজের জন্য যারা ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে তাদের দ্রুত ফের আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। কারণ নির্বাচনে পেশিশক্তির ব্যবহার, মাঠ দখলে রাখা, নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব- এসব প্রসঙ্গ অনেক পুরনো। সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে কাজ করানো হয়।
কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে আলোচিত ১৭৪ জন আসামি মুক্তি পেয়েছেন। এদের মধ্যে ১১ জন তাদের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় আছেন। এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হলেন- নাইম আহমেদ টিটন, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু, আক্তার হোসেন, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, আনিসুর রহমান লিটন ওরফে ফিঙে লিটন, আরমান, হাবিবুর রহমান তাজ, সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে কলাবাগান ইমন। এরা সবাই গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ও হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। জামিনে বের হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল আবার জোড়া খুনে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নির্দেশে দুই যুবককে হত্যার অভিযোগে হেলালের বিরুদ্ধে ফের মামলা হয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, আমরা দেখেছি শেখ হাসিনা সরকার পরিবর্তনের পর অনেকের জামিন হয়েছে। এখানে এমন কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন যারা সমাজের অস্থিরতার জন্য দায়ী হতে পারেন। আমরা পুরান ঢাকায় যে হত্যাকাণ্ড দেখলাম- সেখানেও ভুক্তভোগী জামিনে বের হন। এরপর এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জের ধরে খুন হন। তো জামিনে যারা বের হয়েছেন, তাদের অবস্থা বিবেচনায় যারা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে তাদের দ্রুত আবার আইনের আওতায় নিতে হবে। এছাড়া বৈধ ও অবৈধ দুই ধরনের অস্ত্রই সরকারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া অনেকের অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তাই দ্রুত অপরাধ বন্ধে সংশ্লিষ্টদের এ নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া ৮০ ভাগ অস্ত্রই উদ্ধার করা গেছে, দাবি পুলিশের। সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৩৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজারের বেশি গুলি এখনো বেহাত রয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪২১টি অস্ত্র।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় র্যাব বদ্ধ পরিকর। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, যেখানেই অপরাধ ঘটছে; সেখানেই দোষীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ছাড় দেয়া হচ্ছে এমন নয়। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দেশব্যাপী র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বা জামিনে যারা বের হয়েছেন তারা কিন্তু সার্ভিলেন্সে আছে। আমরা মিরপুরে যুবদল নেতা হত্যাকাণ্ডের আসামিকে কিন্তু কম সময়েই গ্রেপ্তার করেছি। সেখানেও শীর্স সন্ত্রাসীদের নাম রয়েছে। উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, আমরা অনেক কিশোর গ্যাং ধরতে গিয়ে দেখেছি, আসলে দেশের বাইরে বসে তাদের কলকাঠি নাড়ছেন কোনো কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী। বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে।
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর সাদেক খান আড়তের সামনে নাসির ও মুন্না নামে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকার দখল নিতে সন্ত্রাসীদের দুই পক্ষের বিরোধ থেকে এই হত্যার ঘটনা ঘটে।
একই বছরের ১০ অক্টোবর হাতিরঝিল থানার মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট ভাগাভাগি নিয়ে দ্ব›েদ্বর জেরে খুন হন দীপ্ত টেলিভিশনের স¤প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা তানজিল জাহান ইসলাম তামিম। জামিনে কারামুক্ত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের ঘনিষ্ঠরা এই হত্যায় জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে থাকা অবস্থাতেই মিরপুরের অপরাধজগতের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল কিলার আব্বাস নামে পরিচিত আব্বাস আলীর হাতে। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার তৎপরতা আরো বেড়ে যায়।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে দলবল নিয়ে মহড়া দিয়েছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। এ নিয়ে সেখানকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। পরে চলতি বছরের ২৭ মে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। তাদের তথ্যে হাতিরঝিল থেকে সুব্রত বাইনের সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১০ জানুয়ারি রাতে টার্গেট করে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে কোপানো হয় দুই ব্যবসায়ীকে। চাঁদা না পেয়ে দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার। এই ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির দ্ব›দ্ব সামনে আসে। তারা দুইজন ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর গত ১৫-১৬ আগস্ট কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদরদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও সুযোগ বুঝে প্রকাশ্যে চলে এসেছেন। আধিপত্য বিস্তারে বিভিন্ন এলাকায় মহড়া থেকে শুরু করে দখল, চাঁদাবাজি চলছে। বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে অবস্থান করে তাদের অনুসারীদের নিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তবে অপরাধ ঘটিয়ে কেউ পার পাচ্ছে না। কিন্তু আগেই তাদের কর্মকাণ্ড রোধ করতে না পারাকে কিছুটা গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেন তিনি।
মিরপুরে চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর ভয়ংকর ফোর স্টার গ্রæপ : পুলিশ বলছে, মিরপুর এলাকায় চার সন্ত্রাসীর ফোর স্টার গ্রুপ সেই এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন ওরফে ডি বøকের মামুন, কিলার ইব্রাহিম, শাহাদাত ও সিন্ডিকেট মুক্তার- এই চারজন মিলে গড়ে তুলেছেন ফোর স্টার গ্রুপ।
পল্লবীতে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তারের পর তারা মিরপুরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা ফোর স্টার গ্রæপের সদস্য বলে জানিয়েছিল র্যাব। র্যাব বলছে, ফোর স্টার গ্রুপ মিরপুরকে চারটি ভাগে ভাগ করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। র্যাব-৪ অধিনায়ক মাহবুব আলম বলেন, মিরপুরে যেসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে, এর পেছনে আমরা ফোর স্টার গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছি। ফোর স্টার মানে চারজন স্টার সন্ত্রাসী- মামুন, কিলার ইব্রাহিম, সন্ত্রাসী শাহাদাত, সন্ত্রাসী মুক্তার- এদের ছত্রছায়ায় গ্রুপটি পরিচালিত হয়। এদের নির্দেশে মিরপুরে যেসব অরাজকতা সন্ত্রাসী কার্যক্রম করা হয়, তাদের একটা মদদ রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। কিবরিয়া হত্যায় গ্রেপ্তার পাতা সোহেল ও সুজন ফোর স্টার গ্রুপের ইব্রাহিম এবং মামুন নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কার্যক্রমে লিপ্ত ছিল বলে জানান তিনি।
ফোর স্টার গ্রুপ গড়ে তোলা চারজনই বিদেশে বসে গোটা মিরপুরকে চার ভাগে ভাগ করে চালাচ্ছেন অপরাধ কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে মামুনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা, ইব্রাহিম মিরপুর ১৩, ১৪, ভাসানটেক ও কালশী। শাহাদাতের দখলে আছে মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭। মিরপুর ১০ ও ১১-তে দাপট মুক্তার ও তার অনুসারীদের। এসব এলাকার চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করছে না। যদিও এসব নিয়ে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। পুলিশের তথ্য বলছে, মামুন মালয়েশিয়ায় থাকেন। বড় ভাই জামিল ও ছোট ভাই মশিউর দেশে তাদের হয়ে সামলান সবকিছু। তাদের হয়ে আরো কাজ করেন দেলোয়ার হোসেন রুবেল, রফিকুল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, রাজন, সানি, ভাগ্নে মামুন, সোহেল, কায়েস। ইব্রাহিম থাকেন ফ্রান্সে। তার হয়ে কাজ করছেন যুবরাজ, সাবু, শাকিল, ভাগ্নে সোহেল, জনি ও কালা ইব্রাহিম। একসময় ভারত থাকলেও শাহাদাত এখন থাকেন ইতালিতে। তিনি মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার নির্দেশে টিপু সুমন, ফিটিং শিশির, বিহারি নিলা, প্রচার সাইফুল, পিচ্চি আলামিন, শামিম কাজ করেন। মুক্তার কখনো ভারত, কখনো নেপালে থাকেন। যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মুক্তারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন হাড্ডি সোহাগ, নওশাদ, আশিক, ডাসা শরিফ, অ্যালেক্স জুয়েল, শুটার জাকির, তপু, আমিন, রকি, ছোট রাকিব, শাহাপরান, মিঠুসহ অনেকে। ইব্রাহিম ও মামুন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মিরপুরজুড়ে বিএনপি নেতাদের ছবি ব্যবহার করে বড় বড় ব্যানার ঝুলিয়েছে তারা। প্রায় ৩ মাস আগে ৫ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে মিরপুরের পল্লবী সাগুফতা এলাকার এ কে বিল্ডার্সে হামলা করেন ফোর স্টার গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন। হামলাকারীদের বেশির ভাগই তরুণ ও কিশোর। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের এমন তাণ্ডব মিরপুর এলাকার এখনকার নিত্যদিনের ঘটনা। ৩০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ভাসানটেকে বেলায়েত হোসেন নামের একজনের বাড়িতে এভাবেই কয়েক দফা হামলা চালায় কিলার ইব্রাহিম বাহিনীর সদস্যরা। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় টিনশেড বাড়িটি।
ভুক্তভোগী বেলায়েত হোসেন তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ফ্রান্স থেকে কিলার ইব্রাহিম ফোন করে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। টানা কয়েকদিন ধরে এই হামলার ঘটনা চললেও পুলিশ কিছুই করেনি। সন্ত্রাসীদের মদদে মাদকের রমরমা কারবারও চলছে মিরপুরে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মাদক কারবারে বাধা দেয়ায় মামুন নামের এক যুবককে বাসা থেকে ডেকে কুপিয়ে জখম করে সন্ত্রাসীরা। স্বজনদের অভিযোগ, এই ঘটনায় উল্টো মামুনকেই গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা-পুলিশ।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর জোনে হত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৪২ জন। এর মধ্যে শুধু পল্লবীতেই খুন হয়েছে ১৫ জন। মিরপুর মডেল থানায় ৯টি, দারুস সালাম থানায় ৭টি, রূপনগর থানায় ৪টি, কাফরুল থানায় ৩টি এবং ভাসানটেক ও শাহ আলী থানায় দুটি করে মামলা হয়েছে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনসহ খুব দ্রæত দোষীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য আমাদের কাছে আসলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগেও অনেককে গ্রেপ্তার করছি, যাদের বিষয়ে তথ্য পাচ্ছি তাদের গ্রেপ্তার করছি। চাইলেই পরিস্থিতি ঘোলাটে করা সম্ভব হবে এমন নয়। এবারই নির্বাচন সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে ডিএমপি অপরাধ রোধে নানা উদ্যোগও নিচ্ছে।
কার নিয়ন্ত্রণে কোন এলাকা : এছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, বসিলা, মোহাম্মদপুরের একাংশ ও লালবাগ নিয়ন্ত্রণ করেন। পাইকপাড়া, কল্যাণপুর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের কিছু অংশে পিচ্চি হেলালের অনুসারীরা চাঁদা তোলে বলে অভিযোগ রয়েছে। মিরপুর ১ ও শাহ আলীতে ব্যবসা, ঠিকাদারি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের সহযোগীরা। জিসান গুলশান ও বাড্ডা এবং সুইডেন আসলাম তেজগাঁও, রাজাবাজার ও ফার্মগেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে পুলিশের নথিপত্র বলছে। সুব্রত বাইন একসময় মগবাজার, মতিঝিল, পল্টন ও মালিবাগে প্রভাবশালী থাকলেও তার গ্রেপ্তারের পর জিসান গ্রæপ এখন মালিবাগ, মতিঝিল, মগবাজার ও মহাখালী নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিদেশে থেকেও এলাকা নিয়ন্ত্রণ : গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পেরেছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে জাফর আহমেদ মানিক যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার যাতায়াত আছে।
তানভীরুল ইসলাম ওরফে জয় দুবাই আছেন বলে প্রচার আছে। আগা শামীম, জব্বার ও ফ্রিডম ইমাম ভারতে আছেন বলেও জানতে পেরেছে পুলিশ। প্রকাশ বিশ্বাস ও হারিস আহমেদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। ভিপি হান্নান ইউরোপের কোনো একটি দেশে আছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন ভোরের কাগজকে বলেন, পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফায়দা লোটা সম্ভব হবে না। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। তিনি বলেন, এছাড়া যেখানেই অপরাধ ঘটছে ছাড় পাচ্ছে না কেউ। পুরান ঢাকা বা মিরপুরসহ অনেক ঘটনাই যে সন্ত্রাসী বাহিনী করুক আইনের আওতায় আসছেন। গোয়েন্দা ব্যার্থতা নয় সফলতার কারণেই অনেক কম সময়ে আমরা তাদের গ্রেপ্তারে সমর্থ হচ্ছি। এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, যে পরিমাণ অস্ত্র-গোলোবারুদ লুট হয়েছিল ৮০ ভাগই উদ্ধার করা গেছে। পুলিশের নজরদারি চলমান রয়েছে। চাইলেই অবনতি ঘটানো সম্ভব হবে না।
