×

গণমাধ্যম

সমাচার দর্পণ

বাংলা সংবাদ জগতের প্রথম আয়না, ২০৮ বছরের ইতিহাস

Icon

মো. নাজমুল হাসান

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

বাংলা সংবাদ জগতের প্রথম আয়না, ২০৮ বছরের ইতিহাস

ছবি : সংগৃহীত

ভাষার সংবাদপত্রের ইতিহাসে ২৩ মে একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৮১৮ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর মিশনারি কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’। এর মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক নবজাগরণের সূচনা ঘটে। শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন এই পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিশন উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের নেতৃত্বে শিক্ষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশের আগে ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে একই মিশন থেকে ‘দিগদর্শন’ নামে একটি বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা বাংলা ভাষার প্রথম সাময়িকী হিসেবে বিবেচিত। সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান। এর পরপরই সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জন্ম নেয় ‘সমাচার দর্পণ’।

এর আগেই উপমহাদেশে সংবাদপত্রের সূচনা ঘটে ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রকাশের মাধ্যমে, যা প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃত। তবে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ছিল ‘সমাচার দর্পণ’।

১৮১৮ সালের ২৩ মে, শনিবার (১০ জ্যৈষ্ঠ ১২২৫ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয় এর প্রথম সংখ্যা। প্রথম তিন সপ্তাহ এটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়, পরে মাসিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় দেড় টাকা। প্রকাশক ছিল ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি এবং প্রকাশনা কেন্দ্র ছিল শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস।

পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের নাম থাকলেও বাস্তবে এতে বাঙালি পণ্ডিতদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কার এবং পরবর্তীতে তারিণীচরণ শিরোমণি।

পত্রিকার নাম ‘সমাচার দর্পণ’ অর্থাৎ “সংবাদের আয়না”। এতে দেশ-বিদেশের খবর, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ঘটনা, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহসহ নানা বিষয় প্রকাশিত হতো।

সময় পরিক্রমায় এটি নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়- প্রথমে সাপ্তাহিক, পরে ১৮৩২ সাল থেকে সপ্তাহে দুই দিন প্রকাশিত হয়। ১৮২৬ সালে এর ফারসি সংস্করণও প্রকাশিত হয়। ১৮২৯ সাল থেকে এটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে।

১৮৩৬ সালে এর প্রচারসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০০, যা সে সময়ের হিসেবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ২৩ বছর ধারাবাহিক প্রকাশনার পর ১৮৪১ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়, পরে স্বল্প সময়ের জন্য পুনরায় প্রকাশিত হলেও ১৮৫২ সালে চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে ‘সমাচার দর্পণ’-এর অবদান অনস্বীকার্য। তখন বাংলা সাহিত্য মূলত পদ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই পত্রিকার মাধ্যমে বাঙালি পাঠক প্রথম নিয়মিত গদ্য সংবাদ ও প্রবন্ধ পড়ার অভিজ্ঞতা লাভ করে, যা বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

এটি বাংলা সাংবাদিকতারও ভিত্তি স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে ‘সংবাদ কৌমুদী’ (১৮২১) সহ আরো অনেক পত্রিকার পথ তৈরি করে।

তবে পত্রিকাটি ধর্মীয়ভাবে নিরপেক্ষ না থেকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি পরোক্ষভাবে পক্ষপাতমূলক ছিল বলে সমালোচনাও রয়েছে। এ নিয়ে রাজা রামমোহন রায়ের সঙ্গে বিতর্কের কথাও ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ‘সমাচার দর্পণ’ আজও গবেষকদের কাছে মূল্যবান উৎস। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিষয়বস্তু সংকলন করে ইতিহাসচর্চায় বিশেষ অবদান রাখেন।

প্রায় দুই শতকেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি শুধু সংবাদপত্র ছিল না, এটি ছিল বাংলা সমাজের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাই ২৩ মে আজও বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।

আজ ২৩ মে -‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশের ২০৮তম বর্ষপূর্তি।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভারতে অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে ধর্ষণ করলেন চিকিৎসক

ভারতে অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে ধর্ষণ করলেন চিকিৎসক

আরও দুই মাস বাড়ছে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আরও দুই মাস বাড়ছে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় ফার্নান্দেজ

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় ফার্নান্দেজ

উত্তরের ঈদযাত্রায় এলেঙ্গা-যমুনা সেতু অংশে যানজটের শঙ্কা

উত্তরের ঈদযাত্রায় এলেঙ্গা-যমুনা সেতু অংশে যানজটের শঙ্কা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App