দেশজুড়ে তেলের সংকট, বন্ধ পেট্রল পাম্প
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৫১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। অনেক জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের ৪৩টি বন্ধ রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের ২০টি স্টেশনের প্রতিটি জ্বালানি ‘তেলশূন্য’। সেগুলো রবিবার বন্ধ করে রাখা হয়। সবমিলিয়ে জেলাজুড়ে হাজার হাজার গ্রাহক তেল কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরে যাচ্ছেন। তেল সংকটে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক পেট্রল যাচ্ছে। অকটেনের সরবরাহ বন্ধ। তবে চাহিদার বিপরীতে ডিজেল পাচ্ছেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ। জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে না পেরে গ্রাহকদের গালিগালাজ শুনছেন। এজন্য অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
রাজশাহীতে ৪৪টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ আছে। বাকিগুলোতেও তেল নেই বললেই চলে। ফলে জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন যানবাহন চালকরা।
জেলার গণমাধ্যমকর্মী মাহী ইলাহি বলেন, সোমবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জেলা ও মহানগরীর ২০টি পাম্প ঘুরেছি। কোথাও তেল পাইনি। ঈদের দিন থেকেই বন্ধ আছে জেলার অধিকাংশ পাম্প। যে পাম্পে যাচ্ছি বলছে তেল নেই। এর মধ্যে কিছু পাম্প তেল পেলেও তা বিক্রি করছে না। যারা ডিপো থেকে নিয়ে আসছে তারা বিক্রি না করে মজুত করে রাখছে।
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান শিমুল বলেন, পাম্পগুলোতে যা মজুত ছিল তা ঈদের আগেই শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত কোনও পাম্পে আর পেট্রল ও অকটেন নেই। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা এসে পাম্পগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। তেল নেই অধিকাংশ পাম্পে নোটিশ দিয়ে দড়ি টানিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।’
আরো পড়ুন : ডিআরইউ সদস্যদের জন্য জ্বালানি তেল সরবরাহ ঘোষণা
তিনি বলেন, বাঘাবাড়ি ডিপোতে আমাদের লরি গেছে। লরিতে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেলের ধারণক্ষমতা। কিন্তু পাওয়া গেছে তিন হাজার লিটার। আমরা পরিবেশকদের বলেছি পর্যাপ্ত তেল দিতে। যদি পাওয়া যায় মঙ্গলবার বিক্রি হবে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। পেট্রল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন তিনি, তেল বিক্রি শুরু হলে গ্রাহকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। পুলিশ দিয়ে কাজ হয় না। এজন্য জেলা প্রশাসককে বলেছি, যেন পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তা না হলে তেল বিক্রি করা সম্ভব হবে না।
তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে ভোগান্তিতে আছেন পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের চালকরা। ঈদের আগের রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হানিফ ফিলিং স্টেশনে ভবনের কাচ ভাঙচুর করেছেন তারা।
কয়েকজন গ্রাহক বলছেন, তেল থাকতেও দিচ্ছে না, দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করেছেন পাম্পমালিকেরা। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল দেওয়া হচ্ছে। ছোট ছোট বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।
পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশন চোখে পড়ে। এর মধ্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমানায় ২৫টি পাম্প বন্ধ; সেখানে অকটেন ও পেট্রল নেই। বীরগঞ্জ থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২১টি পাম্পের মধ্যে তিনটিতে শুধু পেট্রল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে গ্রাহকদের লম্বা সারি। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে হাজির হয়েছেন, কেউ বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। গ্রাহকদের ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। সিরিয়াল ভাঙতে দেখলেই শুরু হচ্ছে হইহুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি।
কিছু ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ও কর্মচারী জানান, প্রতিটি লরিতে (তেলবাহী ট্রাক) ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের জন্য তিনটি চেম্বার থাকে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল পেয়েছেন। বাকি দুটি চেম্বার খালি। এতে পরিবহন খরচও বাড়ছে। পাম্পগুলোয় দৈনিক পেট্রলের চাহিদা ৭০০ থেকে দেড় হাজার লিটার, অকটেন ৩৫০ থেকে ৭০০ লিটার। আর ডিজেলের চাহিদা দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার। তারা ঈদের আগে জ্বালানি পেয়েছেন; তাও অর্ধেক।
ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘গত শুক্রবার তেল পেয়েছি। তিন দিন পর আজ সাড়ে তিন হাজার লিটার পেট্রল পেলাম। সন্ধ্যায় গাড়ি এসে পৌঁছাবে। রেশনিং পদ্ধতিতে (প্রতিজন ২০০ টাকার) দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। এখানে আমাদের হাতে কিছু নাই। ডিপো থেকে তেল না পেলে আমরা কী করব?’
পঞ্চগড় ধাক্কামাড়া এলাকায় একটি পাম্পের কর্মচারী ফারুক আলম বলেন, ‘একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি আসে, একফোঁটা জ্বালানি দিতে পারবো না। আর পেট্রল, যার দুই লিটার হলেও চলবে, সে নিচ্ছে পাঁচ লিটার। আমরা দুই লিটারের বেশি দিই না। অনেকে এ পাশ থেকে তেল নিয়ে, আবার পেছন থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। যদি তেলের সংকট আরও বাড়ে, এই ভেবে মানুষ রিজার্ভও করছে।’
চট্টগ্রামের বেশ কিছু পেট্রল পাম্পে গত কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মিলছে না। কিছু পাম্প বন্ধ রয়েছে। কোনও কোনও পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চালকরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রল পাম্প আছে ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর ৭৯৯ জন এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ২৫৫ জন।
পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪৬টির মতো পেট্রল পাম্প আছে। কোনও কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলে অকটেন নেই, আবার অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। তবে মঙ্গলবার বিকালের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে বলে মনে করছি। কারণ ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় তেল কেনায় পে-অর্ডার করা যায়নি। মঙ্গলবার ব্যাংক খোলা হলে পে-অর্ডার জমা দেওয়া হবে। বিকালের মধ্যে পাম্পগুলোতে তেল স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
ময়মনসিংহের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন ঈদের দিন সকাল থেকেই বন্ধ রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। তবে বেশি বিপাকে পড়েছেন মোটরবাইক চালকরা। রবিবার দু’একটি ফিলিং স্টেশন মাঝেমধ্যে খুলে যানবাহন চালকদের তেল দিতে দেখা গেছে।
নগরীর পুলিশ লাইনস সংলগ্ন সাইফুল ফিলিং স্টেশনকে ঈদের দিন সকাল থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ পাওয়া গেছে। সাইফুল ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামরুল হাসান বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে মজুতকৃত জ্বালানি তেল ঈদের আগের দিন রাতেই শেষ হয়ে গেছে। তেল না থাকায় ঈদের দিন সকাল থেকে স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। জ্বালানি তেল পাওয়া গেলেই আবার খোলা হবে।’
নগরীর চুরখাই রওশন ফিলিং স্টেশন ঈদের আগের দিন থেকেই বন্ধ। এখানকার কর্মচারী শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় ঈদের আগের দিন থেকেই স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মচারীরা সবাই ঈদ করতে বাড়ি চলে গেছেন। তেল পাওয়া গেলে স্টেশন খোলা হবে।
তবে নগরীর শিকারিকান্দা সওদাগর ফিলিং স্টেশন সোমবার দুপুরে খুলে পাওয়া যায়। দুই ঘণ্টার জন্য খোলা রেখে যানবাহন চালকদের তেল দেওয়া হয়েছে। মজুত শেষ হলে বিকালে আবার বন্ধ করা হয়।
বগুড়ার ৭২টি ফিলিং স্টেশনের অর্ধেকের বেশি জ্বালানি তেল শূন্য। এতে যানবাহন চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি মিজানুর রহমান রতন জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আজকালের মধ্যে কিছু জ্বালানি আসছে, যা দিয়ে সংকট কিছুটা লাঘব হবে।
রংপুরের ৪০ ফিলিং স্টেশনের বেশিরভাগে জ্বালানি নেই। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ২০টি স্টেশন বন্ধ। ডিপো থেকে তেল না পাওয়ায় সোমবার দুপুরের পর থেকে মজুতশূন্য হয়ে পাম্পগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
খুলনা জেলায় ৩৬টি পাম্প রয়েছে। চাহিদা মতো তেল না পাওয়ায় সবগুলো পাম্পই সংকটে রয়েছে। ডিপো থেকে যা তেল দেওয়া হয়, তা ৪–৬ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। নতুন তেল আসলে পাম্পগুলো আবার চালু হবে।
বরিশাল নগরী ও ১০ উপজেলার মহাসড়কের পাশে পেট্রল পাম্পগুলো ঠিকমতো তেল দিতে পারছে না। বিশেষ করে ডিজেল না হলে পেট্রল বা অকটেনের সংকট লেগেই আছে। অনেক পাম্প দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে। তেল পাওয়া গেলে পাম্প খোলা হয়।
এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় তেলের সংকট চালক ও সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
