সরকারের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হচ্ছে: টিআইবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে যে নীতি বর্তমান বিএনপি সরকার নিয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সরকারের সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ‘পেছনে হাটার’ ইংগিত দেখতে পাচ্ছে এ সংস্থা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে অধ্যাদেশ রহিত, বাতিল বা সংশোধন নিয়ে টিআইবির অবস্থান তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কিছু অধ্যাদেশ বিল আকারে এগোলেও কিছু অধ্যাদেশ এখনই না এনে আরও পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গতকাল ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। দ্বিতীয়ত আইনমন্ত্রী বলেছেন, গুম অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যদি আইনে পরিণেত করা হয়, তাহলে গুমের শিকার ও অমানবিকতার শিকার ব্যাক্তিরা অন্যায়ের শিকার হবেন।
“এটাকে তিনি আরও বেশি যুগোপযোগী করার কথা বলেছেন, যাতে করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। আমরা তাদের দুজনের বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু আস্থা রাখাটা কঠিন হচ্ছে। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তারা যেটা বলছেন, তারা সেটি কাজে রূপান্তর করার ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না।”
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই–বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ২ এপ্রিল মোট ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার জন্য সুপারিশ করেছে। যা সাধুবাদ পাবার যোগ্য।
“তবে আইনে পরিণত হতে যাওয়া সব অধ্যাদেশের সবই দুর্বলতাহীন নয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। যেমন–সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও এরমধ্যে রয়েছে।”
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশটিতে এখনো যে ‘সবচে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি’ রয়েছে, তা মহা হিসাব-নিরীক্ষকের ‘সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থি’।
“স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় দুষ্ট। মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার যেমন- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা পায় সরকার। যেখানে বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থে সরকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নির্বাচিত সরকারও নিজের ইচ্ছেমত সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করেছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থি।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশকে রহিত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এই তিনটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কোনো টাইমলাইনও ঠিক করেনি বা ভবিষ্যতে করা হবে তার ইংগিতও দেয়নি।
“মানবাধিকার কমিশন ও দুদকসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয়। তৃতীয় ধাপে থাকা পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এনে পাসের কথা বলা হয়েছে যদিও এসব ক্ষেত্রে কি ধরনের পরিবর্তন আনা হবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।”
টিআইবি বলছে, এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে, সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাটার ইংগিত দিচ্ছে, যা দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দূরীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করত। অন্যদিকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যা চরম দুর্বলতার কারণে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য সেটিতে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার বিধান সংযুক্ত করে বিল আকারে পাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা হতাশাজনক।
