×

রাজনীতি

ঐতিহাসিক ৬ দফা

বাঙালির মুক্তি সনদের ভিত্তিপ্রস্তর

Icon

গীতাঞ্জলি দাস আলো

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

বাঙালির মুক্তি সনদের ভিত্তিপ্রস্তর

৬ দফাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি

৭ জুন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচির পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টি করে। এই দিনটি ‘৬ দফা দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা তৈরি করেছিলো।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হতে থাকে। ভাষার অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক অবহেলা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন পূর্ব বাংলার জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল পূর্ব বাংলার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সনদ।

বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ছিলো নিম্নরূপ:

প্রথম দফা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দ্বিতীয় দফা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক ক্ষমতা থাকবে। অন্যান্য সকল বিষয় প্রদেশগুলোর হাতে অর্পিত হবে।

তৃতীয় দফা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। অথবা সমগ্র পাকিস্তানের জন্য একই মুদ্রা থাকলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে সাংবিধানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।

চতুর্থ দফা রাজস্ব ও কর ধার্যের ক্ষমতা প্রদেশগুলোর হাতে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রদেশগুলো থেকে নির্ধারিত হারে রাজস্ব কেন্দ্রকে প্রদান করবে।

পঞ্চম দফা বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক হিসাব থাকবে। নিজস্ব অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে সংশ্লিষ্ট প্রদেশ।

ষষ্ঠ দফা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি আধা-সামরিক বাহিনী বা প্যারামিলিশিয়া গঠনের ক্ষমতা থাকবে।

এই ৬ দফা ছিল মূলত বাঙালির মুক্তির সনদ। দফাগুলোতে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মুক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ছিলো।

৬ দফা কর্মসূচি পেশ করার পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু বাঙালি জনতা ৬ দফাকে তাদের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। আওয়ামী লীগ ৭ জুন ১৯৬৬ তারিখে সারা দেশে সাধারণ ধর্মঘট ও হরতালের ডাক দেয়।

সেদিনের কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ ও ইপিআর-এর গুলিতে ঢাকায় মনু মিয়া, শফিক, আবুল হোসেনসহ অন্তত ১১ জন শহিদ হন। নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, এবং অন্যান্য স্থানেও পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। ৭ জুনের এই রক্তস্নাত ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনমনীয় সংকল্প ব্যক্ত করে।

৬ দফা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ৬ দফাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। একে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়।

৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। কারাগারে থাকা অবস্থায়ও তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়, এবং তাঁকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

৭ জুনের রক্তস্নাত ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাঙালি জাতি আর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন-শোষণ মেনে নেবে না। সাধারণ কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে ছাত্র-বুদ্ধিজীবী—সবাই এই আন্দোলনে শামিল হন।

৬ দফা আন্দোলনের ফলে আন্তর্জাতিক মহলে পূর্ব বাংলার প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে এই সহানুভূতি মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৬ দফা দিবস কেবল একটি স্মরণীয় তারিখ নয়, এটি বাঙালির অধিকার সচেতনতা, আত্মত্যাগ ও স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতীক। ৭ জুনের রক্তস্নাত ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্য কত বিশাল। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ছিল এক নব দিগন্তের সূচনা, যা ধাপে ধাপে বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বর্ণদ্বারে। এই ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশ

মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশ

‘হরমুজ প্রণালিই ইরানের পরমাণু বোমা’

‘হরমুজ প্রণালিই ইরানের পরমাণু বোমা’

দাম কমলো জেট ফুয়েলের

দাম কমলো জেট ফুয়েলের

হাসনাবাদ গ্রিডের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎহীন নারায়ণগঞ্জ

হাসনাবাদ গ্রিডের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎহীন নারায়ণগঞ্জ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App