×

মুক্তচিন্তা

টিকাদান ভাঙনের মূল্য: অর্জনের উত্তরাধিকার, নীতিগত বিচ্যুতি এবং শিশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

টিকাদান ভাঙনের মূল্য: অর্জনের উত্তরাধিকার, নীতিগত বিচ্যুতি এবং শিশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

টিকাদান ভাঙনের মূল্য: অর্জনের উত্তরাধিকার, নীতিগত বিচ্যুতি এবং শিশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে উজ্জ্বল সাফল্যগুলোর একটি হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)। কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রয়াসে এই কর্মসূচি শুধু একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে গত দেড় দশকে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এই কর্মসূচিকে একটি উচ্চ পর্যায়ের কভারেজে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

২০১৯ সালের মধ্যে দেশে হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ৯৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

এই ধারাবাহিকতা কেবল সংখ্যার সাফল্য নয়; এটি ছিল অবকাঠামো, সরবরাহ চেইন, মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের একটি সুসংহত সমন্বয়ের ফল।

কিন্তু সেই অর্জনের ভিত্তিতেই আজ প্রশ্ন উঠছে- কেন এই শক্তিশালী কাঠামো হঠাৎ করে দুর্বল হয়ে পড়ল?

নীতিগত বিচ্যুতি: ধারাবাহিকতা ভাঙার সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সেক্টর প্রোগ্রাম কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা এই কাঠামো স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাতের প্রায় সব কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পরিচালনা করত।

চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই পঞ্চম কর্মসূচি চালুর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে নেওয়া হয় একটি ‘ট্রানজিশন প্ল্যান’, যার মাধ্যমে দুই বছরে নতুন পদ্ধতিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়।

নীতিগতভাবে সংস্কারের এই প্রচেষ্টা আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবতা হলো- স্বাস্থ্যখাত এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ধারাবাহিকতার সামান্য বিচ্যুতিও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই ঝুঁকির বাস্তব রূপই এখন দৃশ্যমান।

মানবসম্পদে আঘাত: ব্যবস্থার মূলভিত্তি দুর্বল হওয়া

এই রূপান্তরের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের মানবসম্পদে। অপারেশন প্ল্যানভিত্তিক কাঠামোর আওতায় নিয়োজিত প্রায় ২৪ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যান।

বেতন-ভাতা বন্ধ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক অস্পষ্টতা, সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এর ফলে কর্মবিরতি, সেবা ব্যাহত হওয়া এবং ডাটা রিপোর্টিংয়ে ঘাটতি দেখা দেয়।

যে কর্মসূচি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর দাঁড়িয়ে, তাদেরকেই অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন সফল করা সম্ভব নয়, এটি একটি মৌলিক বাস্তবতা।

ডাটা বিভ্রান্তি: বাস্তব সংকট আড়াল হওয়ার ঝুঁকি

২০২৫ সালের হামের টিকাদান কভারেজ নিয়ে দুটি ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে- একটিতে কভারেজ ৫৯.৬ শতাংশ, অন্যটিতে ৯১ শতাংশ।

এই পার্থক্যের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, DHIS-এর ডাটা উপজেলা পর্যায় থেকে প্রেরিত, যা অনেক সময় টার্গেটনির্ভর অনুমানভিত্তিক হয়। অন্যদিকে, EPI ড্যাশবোর্ডের তথ্য সরাসরি টিকাদান কার্যক্রম থেকে সংগৃহীত, যা তুলনামূলকভাবে অধিক নির্ভরযোগ্য।

এই দুই ডাটার মধ্যে ৩০ শতাংশের ব্যবধান একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে আমরা কি বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে দেখছি, নাকি একটি 'কমফোর্টেবল' পরিসংখ্যানের আড়ালে সংকটকে ঢেকে রাখছি?

কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা এবং থেমে যাওয়া পুনরুদ্ধার

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো কোভিড-১৯ মহামারি। ২০২০–২০২১ সালে টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বজুড়েই বিঘ্নিত হয়। বাংলাদেশেও কভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং একটি বড় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়।

শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২২-২০২৩ সালে গাভি (Gavi) ও অন্যান্য অংশীদারদের সহায়তায় ক্যাচ-আপ কর্মসূচির মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয় এবং কভারেজ পুনরায় ৯৩ শতাংশে উন্নীত হয়।

কিন্তু এই পুনরুদ্ধার ২০২৪–২০২৫ সালে এসে স্থবির হয়ে পড়ে। নতুন প্রশাসনিক পরিবর্তন, সমন্বয়হীনতা এবং সরবরাহ সংকট- সব মিলিয়ে অগ্রগতির ধারা থেমে যায়।

হামের প্রাদুর্ভাব: পূর্বাভাসিত বিপর্যয়ের বাস্তবতা

২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলাফল।

হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ৯৫ শতাংশ কভারেজ অপরিহার্য। সেই সীমার নিচে নেমে গেলে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক শিশু টিকা পাওয়ার আগেই সংক্রমিত হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ ইতোমধ্যেই উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে।

দায়বোধের প্রশ্ন: কে নেবে দায়িত্ব?

এই পরিস্থিতিতে দায় নির্ধারণ একটি সংবেদনশীল কিন্তু অপরিহার্য বিষয়।

অতীত সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি কার্যকর কাঠামো- যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, তা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত যদি সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তার দায় বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়।

একইসঙ্গে, বাস্তবতা আড়াল করার প্রবণতাও সমানভাবে ক্ষতিকর। যদি কভারেজ কমে থাকে, তা স্বীকার না করে বিকল্প ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সমস্যার সমাধান করে না, বরং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

জনস্বাস্থ্য খাতে আস্থা সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই আস্থায় ফাটল ধরলে পুনর্গঠন অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত

টিকাদান কর্মসূচির ভাঙন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না, এটি একটি অর্থনৈতিক সংকটেরও সূচনা করে।

হাসপাতালে ভর্তি বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া- সব মিলিয়ে একটি পরিবার এবং বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

অর্থাৎ, আজকের টিকাদান ঘাটতি আগামী দিনের বহুমাত্রিক ক্ষতির ভিত্তি তৈরি করছে।

পথ খোঁজা: দ্রুত পুনর্গঠন জরুরি

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি কয়েকটি পদক্ষেপ- 

১.একটি সমন্বিত ও পরীক্ষিত কাঠামোর দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা

২.মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

৩.টিকাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ব্যাপক ক্যাচ-আপ কর্মসূচি

৪.ভ্যাকসিন সরবরাহ ও কোল্ড চেইন পুনর্বিন্যাস

৫. ডাটা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা

শেষকথা

বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একটি অর্জিত সম্পদ, যা বহু বছরের ধারাবাহিক বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ের শ্রমের ফল।

সেই অর্জনকে টিকিয়ে রাখা যেমন দায়িত্ব, তেমনি তা ভেঙে পড়লে তার দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি।

নীতিগত পরীক্ষানিরীক্ষা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতে সেই পরীক্ষার মূল্য যদি শিশুদের জীবন দিয়ে দিতে হয়- তাহলে তা আর নীতি নয়, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। সামনে পথ দুটি- অর্জনের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন, অথবা অব্যবস্থাপনার মূল্য দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ করা।

নির্বাচনটি নীতিনির্ধারকদের, কিন্তু তার ফল ভোগ করবে একটি প্রজন্ম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে বিএনপি

স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে বিএনপি

গণসংহতির পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

গণসংহতির পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

অস্ত্র-গুলিসহ মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চেয়ারম্যান-কর্মচারী গ্রেপ্তার

অস্ত্র-গুলিসহ মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চেয়ারম্যান-কর্মচারী গ্রেপ্তার

জেএমবি সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে কিশোর হেফাজতে

জেএমবি সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে কিশোর হেফাজতে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App