×

ফুটবল

ব্রাজিলের ৭ গোলের ট্র্যাজেডি কি এবার ট্রফিতে রূপ নেবে?

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

ব্রাজিলের ৭ গোলের ট্র্যাজেডি কি এবার ট্রফিতে রূপ নেবে?

ফাইল ছবি

ফুটবল বিশ্বে অনেক সংখ্যা আছে, যেগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; হয়ে ওঠে স্মৃতি, বেদনা, গৌরব কিংবা অভিশাপ। ব্রাজিলের জন্য ‘৭’ তেমনই এক সংখ্যা। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ইতিহাসে আছে পেলের ১০ নম্বর জার্সি, রোমারিও-রোনালদোর গোল, রোনালদিনিওর হাসি, কাফুর ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। কিন্তু আছে আরেকটি সংখ্যাও—‘৭’। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই ৭ গোল। বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের হার।

একটি ম্যাচ, যা শুধু স্কোরলাইন ছিল না; ছিল এক জাতির ফুটবল-অহংকারে গভীর আঘাত। এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের সমর্থকদের সেই স্কোরলাইন নিয়ে ট্রল শুনতে হয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই কেউ না কেউ সেই পুরোনো ক্ষত জাগিয়ে তোলে। মিমে, আলোচনায়, পরিসংখ্যানে, প্রতিপক্ষের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ৭-১ যেন ব্রাজিলের হলুদ জার্সির গায়ে লেগে থাকা এক অদৃশ্য দাগ।

কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই যে, যে সংখ্যা এক দিন অপমানের প্রতীক ছিল, সেটিই আরেকদিন প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র ৭ দিন বাকি। আর এই ৭ দিনের কাউন্টডাউনে ব্রাজিল দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক প্রশ্নের সামনে: ৭ গোলের ট্র্যাজেডি কি এবার ট্রফির গল্পে বদলে যাবে?

২০১৪ সালের সেই হার ব্রাজিলকে শুধু কাঁদায়নি, ভাবতেও বাধ্য করেছিল। সমস্যা শুধু নেইমারের অনুপস্থিতি বা থিয়াগো সিলভার নিষেধাজ্ঞা ছিল না; সমস্যা ছিল আরও গভীরে—দলীয় কাঠামো, মানসিক প্রস্তুতি, মাঝমাঠের ভারসাম্য, প্রতিপক্ষের প্রেসিং সামলানোর অক্ষমতা এবং আবেগের চাপে ভেঙে পড়ার ভয়ংকর প্রবণতা। জার্মানি শুধু ব্রাজিলকে হারায়নি, ব্রাজিলের ফুটবল-চিন্তাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।

সেই রাতের পর ব্রাজিল ফুটবলে বড় একটি উপলব্ধি তৈরি হয়। শুধু প্রতিভা দিয়ে আধুনিক ফুটবল জেতা যায় না। শুধু ড্রিবলিং, ব্যক্তিগত জাদু, হলুদ জার্সির ঐতিহ্য কিংবা ‘জোগো বনিতো’র স্মৃতি যথেষ্ট নয়। দরকার পজিশনাল শৃঙ্খলা, দরকার প্রেসিং কাঠামো, দরকার বল হারানোর পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া, দরকার এমন এক মিডফিল্ড যা একই সঙ্গে সৃজনশীল ও নিরাপদ। দরকার এমন মানসিকতা, যেখানে ব্রাজিলিয়ান সৌন্দর্য ইউরোপীয় সংগঠনের সঙ্গে মিশে যাবে।

২০২৬ সালে ব্রাজিল সেই জায়গাতেই নতুন করে দাঁড়িয়েছে। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওদের এই দল আগের ব্রাজিলের মতো শুধু আবেগের দল নয়; বরং অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, গতি, কৌশল ও ভারসাম্যের মিশ্রণ। আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি তারকা সামলাতে জানেন। রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলান, চেলসি, বায়ার্ন মিউনিখের মতো বড় ড্রেসিংরুমে বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে তার। ব্রাজিলের মতো প্রতিভায় ভরা কিন্তু প্রত্যাশার চাপে ভারী দলের জন্য এই অভিজ্ঞতা অমূল্য।

এই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ আক্রমণভাগ। একসময় ব্রাজিলের আক্রমণ মানেই ছিল সাম্বার ছন্দ; এখন সেই ছন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিস্ফোরক গতি ও ইউরোপীয় ম্যাচ ইন্টেলিজেন্স। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র একাই ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারেন। বাম দিক থেকে তার দৌড়, ওয়ান-অন-ওয়ান সামর্থ্য, ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে বক্সে ঢোকার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি এই দলের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোর একটি।


রাফিনিয়া ডান দিক থেকে ব্রাজিলকে দেন ভিন্ন মাত্রা। তার কাট-ইন, লং-রেঞ্জ শট, প্রেসিং ও সেট-পিস ডেলিভারি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বড় ম্যাচে রাফিনিয়ার কাজ শুধু গোল করা নয়; প্রতিপক্ষের ফুলব্যাককে ব্যস্ত রাখা, ভিনিসিয়ুসের দিক থেকে চাপ সরানো এবং মাঝেমধ্যে খেলার টেম্পো বদলে দেওয়া। আধুনিক ফুটবলে উইঙ্গারদের শুধু সুন্দর ফুটবল খেললেই হয় না, রক্ষণভাগেও কাজ করতে হয়। রাফিনিয়া সেই জায়গায় বেশ কার্যকর।

নেইমারের উপস্থিতি এই দলের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়। বয়স, চোট, ফিটনেস—সব প্রশ্নই আছে। কিন্তু ‘নেইমার’ নামটি এখনও ব্রাজিলের আক্রমণে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করে। তিনি যদি পুরো ম্যাচের খেলোয়াড় না-ও হন, নির্দিষ্ট সময়ে তার একটি পাস, একটি ফ্রি-কিক বা একটি ড্রিবলিং ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এই বিশ্বকাপ তার জন্য শেষ বড় মঞ্চও হতে পারে। তাই নেইমারের গল্প এখানে শুধু ফুটবলের নয়, উত্তরাধিকার রক্ষারও।

ব্রাজিলের আক্রমণে আরও আছে গতিশীলতা, বিকল্প ও বৈচিত্র্য। কেউ বক্সে ঢুকে শেষ স্পর্শ দিতে পারেন, কেউ লাইন ধরে খেলতে পারেন, কেউ আবার মাঝমাঠে এসে প্লেমেকারের কাজ করতে পারেন। আনচেলত্তির বড় সুবিধা এখানেই যে, তিনি এক ধরনের আক্রমণে আটকে থাকতে বাধ্য নন। প্রতিপক্ষ নিচে নেমে রক্ষণাত্মক খেললে এক রকম পরিকল্পনা, হাই লাইন ডিফেন্স দিলে আরেক রকম, আবার শারীরিক ফুটবল খেললে অন্য রকম। এই বহুমাত্রিকতা ব্রাজিলকে আগের তুলনায় বেশি বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

তবে শুধু আক্রমণ দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। ২০১৪ সালের শিক্ষা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানির বিপক্ষে সেই ম্যাচে ব্রাজিল ভেঙে পড়েছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। ছয় মিনিটের মধ্যে চার গোল হজম করা শুধু রক্ষণভাগের ভুল ছিল না; ছিল পুরো দলীয় কাঠামোর পতন। তাই ২০২৬ সালে ব্রাজিলের আসল পরীক্ষা হবে, তারা চাপের মুহূর্তে কতটা স্থির থাকতে পারে।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সৌন্দর্য নয়, টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি জরুরি। সেখানে ১০ মিনিট খারাপ খেললে টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়। একটি ভুল পাস, একটি বাজে ক্লিয়ারেন্স কিংবা একটি হারানো মার্কিংয়ের জন্য চড়া মাশুল গুনতে হতে পারে। ব্রাজিল যদি এবার ট্রফির কাছাকাছি যেতে চায়, তবে তাদের আক্রমণের আগুনের সঙ্গে রক্ষণভাগের শীতল মস্তিষ্ক লাগবে।

আর এখানেই আনচেলত্তির ভূমিকা বড়। তিনি জানেন, বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচ একইভাবে জেতা যায় না। কখনো বল দখলে রাখতে হয়, কখনো অপেক্ষা করতে হয়, কখনো প্রতিপক্ষকে জায়গা দিয়ে পাল্টা আঘাত করতে হয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ঐতিহ্যগতভাবে বল পায়ে সৌন্দর্য খোঁজে, কিন্তু আধুনিক বিশ্বকাপ চায় পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যাওয়ার ক্ষমতা। আনচেলত্তির ব্রাজিল কি সেটি পারবে?—এই প্রশ্নই টুর্নামেন্টে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

২০১৪ সালের ৭-১ ছিল ব্রাজিলের জন্য এক ধরনের ফুটবলীয় ভূমিকম্প। কিন্তু ভূমিকম্পের পরই তো নতুন স্থাপত্যের প্রয়োজন হয়। ব্রাজিলও সেই ভাঙনের পর নতুন এক প্রজন্ম পেয়েছে, যারা ৭-১-এর ম্যাচটি খেলেনি, কিন্তু তার গল্প শুনে বড় হয়েছে। ভিনিসিয়ুসদের প্রজন্মের কাছে সেই হার সরাসরি স্মৃতি নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক দায়। তারা জানে, ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মানে শুধু খেলে যাওয়া নয়। ব্রাজিলের কাছে বিশ্বকাপ মানে প্রত্যাশা, চাপ, ইতিহাস ও পুনরুদ্ধারের লড়াই।

এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সামনে তাই দুটি যুদ্ধ। একটি মাঠে—প্রতিপক্ষের বিপক্ষে; আরেকটি স্মৃতির সঙ্গে—নিজেদের অতীতের বিপক্ষে। জার্মানির সেই ৭ গোল ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, স্কোরলাইন মুছে ফেলা যাবে না। কিন্তু নতুন ট্রফি জিতলে পুরোনো ক্ষতের অর্থ বদলে যায়। তখন ৭-১ আর শুধু অপমান থাকে না; হয়ে ওঠে পুনর্জন্মের শুরুর বিন্দু।

সমর্থকদের কাছে এবারের ব্রাজিল তাই যেমন আশার, তেমনই উদ্বেগেরও। আক্রমণভাগে আগুন আছে, কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে আগুনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ দরকার। তারকা আছে, কিন্তু তারকার সঙ্গে দলগত সংহতি দরকার। ইতিহাস আছে, কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের কঠোরতা দরকার। ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বকাপ জেতেনি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সোনালি ট্রফি সেলেসাওদের হাতে ওঠেনি। ব্রাজিলের মতো দেশের জন্য এই অপেক্ষা ছোট নয়।

আর তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ‘৭’ সংখ্যাটি আবার ফিরে এসেছে। একসময় ৭ গোল ছিল অপমানের প্রতীক। এবার ৭ দিন বাকি থাকতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে নতুন যাত্রার প্রতীক। ব্রাজিলের আক্রমণের একেকটি দৌড়, নেইমারের একেকটি স্পর্শ, ভিনিসিয়ুসের একেকটি বিস্ফোরণ, রাফিনিয়ার একেকটি কাট-ইন—সবকিছু যেন এক প্রশ্নের দিকেই এগোচ্ছে। ব্রাজিল কি পারবে ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্নকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্নে বদলে দিতে?

টাইমলাইন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উদ্বেগজনক ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি

উদ্বেগজনক ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি

বিশ্বকাপের আগেই বড় পুরষ্কার জিতলেন মেসি

বিশ্বকাপের আগেই বড় পুরষ্কার জিতলেন মেসি

জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার

তিতুমীর জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার

বিশ্বকাপ ভেন্যুতে পানির বোতল নিষিদ্ধ করল ফিফা

বিশ্বকাপ ভেন্যুতে পানির বোতল নিষিদ্ধ করল ফিফা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App