মমতার বাংলায় মোদির বিজেপির উত্থান, নেপথ্যে ৫ 'ম'
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
১৫ বছর আগে মমতা বন্দোপাধ্যায় তিনটি ‘ম’ (মা, মাটি, মানুষ) এর শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। এরপর এই স্লোগানই রাজ্যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিনটি জয়ের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই সমীকরণ যেন নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। কারণ আরো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ম’- মুসলিম, মহিলা, পরিযায়ী, মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী যন্ত্র। এগুলোই মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর দেখা গেছে, বিজেপি ১৯৬টিরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮ আসনের অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)-এর আওতায় বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার পর প্রথম নির্বাচনে তৃণমূল ১০০ আসনের গণ্ডি পার করতেও লড়াই করছে।
আরো পড়ুন : মমতার বাড়ির বাইরে বিজেপির কর্মীদের ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান
বাংলার ৫টি ‘এম’
মহিলা ভোটার:
মহিলা ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের নির্বাচনী সাফল্যের মূল শক্তি। গত এক দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারীকেন্দ্রিক একাধিক প্রকল্প চালু করেছেন, যেমন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ এবং ‘কন্যাশ্রী’। তবে ২০২৬ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপিও নারী ভোটারদের টানতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখে। আর জি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যা মামলাও নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। এই ইস্যুতেই নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৃণমূলকে আক্রমণ করা হয়।
মুসলিম ভোট:
ঐতিহাসিকভাবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার ক্ষমতার নির্ধারক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। ২০২১ সালে তৃণমূল সেই ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টিতে জয় পায়, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশের বেশি। তবে ২০২৬ সালে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলায় ভোটের ধরণে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। উন্নয়ন, ভোটার তালিকা সমস্যা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনকেও সম্ভাব্য ভোট-খণ্ডনকারী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিযায়ী ভোটার:
এই নির্বাচনে পরিযায়ী ভোটাররা একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা এবং নিজেদের বৈধ বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করতে হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যে ফিরে আসেন। এতে নির্বাচনী সমীকরণ আরো জটিল হয়ে ওঠে।
মতুয়া সম্প্রদায়:
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১৭ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মতুয়া সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ক। এই গোষ্ঠীর সমর্থন বিজেপিকে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এবারের নির্বাচনে তাদের অবস্থান ফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র:
এই নির্বাচনে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী কৌশল বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা, বুথ-স্তরের ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল প্রচার এবং ক্যাডার সম্প্রসারণ— সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্র গড়ে তোলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে ক্যাডারভিত্তিক রাজ্য হওয়ায়, বিজেপি তৃণমূলের সংগঠন কাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দিতে বা সেটিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয় বরং একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক প্রভাবের প্রতিফলন। এই পাঁচটি ‘এম’ এর সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
