দুর্ঘটনায় ২২৮ প্রাণহানির ১৭ বছর পর দোষী সাব্যস্ত এয়ার ফ্রান্স ও এয়ারবাস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
২০০৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ২২৮ জন আরোহী নিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল এয়ার ফ্রান্সের ‘এএফ-৪৪৭’ ফ্লাইট। সেই দুর্ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন প্যারিসের একটি আপিল আদালত। অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার দায়ে বিমান পরিচালনাকারী সংস্থা এয়ার ফ্রান্স ও বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) প্যারিসের আপিল আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের একটি নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে কোম্পানি দুটিকে খালাস দিয়েছিল। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আজ উচ্চ আদালত পূর্বের রায় বাতিল করে উভয় প্রতিষ্ঠানকেই দোষী সাব্যস্ত করলেন।
২০০৯ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে কী ঘটেছিল
২০০৯ সালের ১ জুন রাতে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো থেকে ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এয়ারবাস এ-৩৩০ মডেলের একটি যাত্রীবাহী বিমান। মাঝ-আকাশে বিমানটি ঝড়ের কবলে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৮ হাজার ফুট উঁচুতে থাকা অবস্থায় বিমানটির গতি পরিমাপক যন্ত্র বরফে জমে বিকল হয়ে যায়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরে আছড়ে পড়ে বিমানটি।
দুর্ঘটনায় বিমানের ১২ জন ক্রু এবং ২১৬ জন যাত্রীসহ মোট ২২৮ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। নিহতদের বড় অংশই ছিলেন ফরাসি, ব্রাজিলীয় এবং জার্মান নাগরিক। ফরাসি বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দুর্ঘটনার পর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে জটিল উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রথম ২৬ দিনে সমুদ্র থেকে ৫১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে অনেকের মরদেহ বিমানের সিটের সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সমুদ্রের তলদেশের প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালে (দুর্ঘটনার দুই বছর পর) বিমানটির ধ্বংসাবশেষ এবং ককপিটের ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
বিবিসির কাছে দুর্ঘটনায় নিহত এক প্রকৌশলীর (৪০) বাবা জানান, দুর্ঘটনার দুই বছর পর তিনি তার ছেলের দেহের অবশিষ্টাংশ সমাহিত করতে পেরেছিলেন। তার ছেলে রিও ডি জেনিরো বিমানবন্দর থেকে শেষ যাত্রী হিসেবে বিমানে উঠেছিলেন।
আদালত দোষী সাব্যস্ত করার পর এয়ার ফ্রান্স ও এয়ারবাস উভয় কোম্পানিকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২৫ হাজার ইউরো (প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৭২০ মার্কিন ডলার) জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অনেকেই এই জরিমানার পরিমাণকে অত্যন্ত ‘নগণ্য ও প্রতীকী’ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, শত শত মানুষের প্রাণের মূল্যের কাছে এই জরিমানা কিছুই না। তবে এই রায়ের ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোম্পানি দুটির বাণিজ্যিক সুনামের ব্যাপক ক্ষতি হবে।
এদিকে শুরু থেকেই এয়ারবাস ও এয়ার ফ্রান্স তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। ফরাসি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে কোম্পানি দুটি খুব শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টে পুনরায় আপিল করতে পারে। রায়ের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে বিবিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোম্পানি দুটির কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
