সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে রিট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
সুপ্রিম কোর্ট। ছবি : সংগৃহীত
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের জন্য জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে গঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ মোট সাতজন আইনজীবী এ রিটটি করেন। সোমবার (২০ এপ্রিল) রিটটি শুনানির জন্য বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চে ৯৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে। রিটের পক্ষে শুনানি করবেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
এর আগে একই আইনজীবীদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সেই রায়ের ভিত্তিতেই গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন করে। এরপর ধাপে ধাপে জনবল নিয়োগসহ প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
তবে পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ওই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। এতে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য বিচার বিভাগীয় ৪৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট থেকে ১৯ জন কর্মচারীকে পদায়ন করা হয়েছে। অন্য কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে।
আরো পড়ুন : সপ্তাহে ২ দিন ভার্চ্যুয়ালি চলবে হাইকোর্ট
সচিবালয়ের জন্য বাজেট অনুমোদনও পাওয়া গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে ১৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভবন প্রস্তুতের কাজ চলতি এপ্রিল মাসেই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাসে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও আইনি লড়াই চলছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকলেও ১৯৭৪ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায়। পরে বিভিন্ন সময়ে এ কাঠামোয় পরিবর্তন আসে।
১৯৯৪ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে মাসদার হোসেন নামে একজন জেলা জজ রিট করেন। সেই মামলায় ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের পক্ষে রায় দেন, যা ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে। ওই রায়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের জন্য ১২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পরবর্তীতে রাজনৈতিক কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় থাকলেও পূর্ণাঙ্গভাবে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন হয়নি। তবে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সাত আইনজীবী সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে নতুন করে রিট করেন। তাঁদের দাবি ছিল, এই অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে এবং ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর রায় দেন। ওই রায়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীনে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশও আসে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের মতো বিচার বিভাগেরও পৃথক সচিবালয় থাকা উচিত। কারণ বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের স্বাধীন অঙ্গ হিসেবে নির্বাহী ও আইনসভা থেকে আলাদাভাবে কাজ করে।
এরপর ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং ১১ ডিসেম্বর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি তখন সবাইকে বিচার বিভাগের এই ধারাবাহিকতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
