যুদ্ধে নিরাপত্তার দায়িত্বে শিশুদের ব্যবহার করছে ইরান
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি নিরাপত্তা চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিমান হামলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীতে শিশু নিয়োগের নতুন উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিহত শিশুটির নাম আলিরেজা জাফারি। তার মা সাদাফ মনফারেদ স্থানীয় পত্রিকা হামশাহরিকে জানান, তার ছেলে ও স্বামী তেহরানের নিরাপত্তা রক্ষায় বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর টহল ও চেকপোস্টে সহায়তা করছিলেন। ১১ মার্চ তারা দুজনই নিহত হন। খবর বিবিসির।
গত সপ্তাহে তেহরানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক কর্মকর্তা ফার্স নিউজ এজেন্সিকে জানান, তারা ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী “স্বেচ্ছাসেবক” অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা দায়িত্বে শিশুদের কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রসহ দেখেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও আলিরেজার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। কুর্দি সংগঠন হেংগাও জানায়, সে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল এবং চেকপোস্টে উপস্থিত অবস্থায় নিহত হয়।
আলিরেজার মা জানান, তার স্বামী বলেছিলেন চেকপোস্টে জনবল কম ছিল, মাত্র চারজন দায়িত্বে ছিলেন। তাই তিনি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যান। এ সময় তাকে সামনে আসা দিনের জন্য তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে বলেও জানানো হয়। মা আরো বলেন, তার ছেলে বলেছিল, আমরা হয় এই যুদ্ধে জিতব, নয়তো শহীদ হবো।
আরো পড়ুন : ইরান ইস্যুতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন ট্রাম্প
হামশাহরি পত্রিকার দাবি, তারা ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক ছাড়া এ দাবি যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে।
আইআরজিসির গ্রেটার তেহরান ইউনিটের কর্মকর্তা রহিম নাদালি জানান, ‘হোমল্যান্ড ডিফেন্ডার ফাইটার্স ফর ইরান’ নামে নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের বিভিন্ন দায়িত্বে—যেমন টহল ও চেকপোস্টে মোতায়েন—কাজে লাগানো হবে। মসজিদ ও জনসমাবেশস্থল থেকে তাদের নিয়োগ করা হতে পারে।
বাসিজ হলো আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া, যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। এটি সাধারণত ভিন্নমত দমনে রাস্তায় মোতায়েন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল কয়েকটি বাসিজ চেকপোস্টে হামলার দাবি করেছে।
সরকারি ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিবিসি চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে, যারা তেহরান, কারাজ ও রাশত শহরে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের চেকপোস্টে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। তেহরানের পূর্বাঞ্চলের এক তরুণী জানান, ৯ মার্চের এক বিমান হামলার পর তিনি বাইরে গিয়ে অস্ত্রধারী কিশোরদের বাসিজ বাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন। আরেকজন জানান, ২৫ মার্চ পশ্চিম তেহরানে একটি চেকপোস্টে এক কিশোরকে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
কারাজের এক বাসিন্দা জানান, ৩০ মার্চ তিনি একটি চেকপোস্টে কালাশনিকভ হাতে এক কিশোরকে দেখেছেন, যার গোঁফও ঠিকমতো ওঠেনি। রাশতের এক নারী বলেন, তারা মুখ ঢেকে রাখলেও চোখ দেখেই বোঝা যায় তারা শিশু। তাদের জন্য মায়া লাগে, আবার ভয়ও লাগে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এ ঘটনাকে শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং ১৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা বিল ভ্যান এসভেল্ড বলেন, শিশুদের লক্ষ্য করে এমন নিয়োগ কার্যক্রমের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ পেগাহ বানিহাশেমি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে শিশুদের সামরিক বা নিরাপত্তা ভূমিকায় ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেআইনি। এতে অনভিজ্ঞ কিশোরদের মাধ্যমে সহিংসতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ হলি ডাগরেস বলেন, নিরাপত্তা চেকপোস্টে শিশুদের ব্যবহার দেশটির শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও জনসমর্থনের ঘাটতির ইঙ্গিত।
