একদিনে ১৩ সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, নেপথ্যে কী?
নাজমুল হাসান, ভোরের কাগজ
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
একদিনেই নারী-শিশুসহ প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
শুক্রবার (৫ জুন) ভোর থেকে শুরু হওয়া এসব অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
একদিনে উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের ৫ জেলার অন্তত ১৩টি সীমান্ত এলাকায় পৃথকভাবে এসব পুশ-ইনের অপচেষ্টা চালানো হয়। হতভাগ্য এসব মানুষ এখনো সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকা পড়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আগামী ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত সম্মেলনকে সামনে রেখে ভারতীয় পক্ষ পুশ-ইনের চেষ্টা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। মূলত সম্মেলনে আলোচনার আগে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতেই এই ব্যাপক অপচেষ্টা বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
সবচেয়ে বেশি পুশ-ইনের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে লালমনিরহাট জেলায়। বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও আদিতমারী উপজেলার বেশ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। এর মধ্যে ভোর ৫টার দিকে ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন বড়খাতা বিওপি এলাকায় ১১ জন এবং পয়ষট্টিবাড়ি বিওপি এলাকায় আরও ১০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন দুর্গাপুর ও দিঘলটারী বিওপির সীমান্ত পিলার ৯২৫ ও ৯২৭-এর কাছে আরো ১২ জনের উপস্থিতি লক্ষ্য করে বিজিবি।
এ ছাড়া, বিজিবি সূত্রে আরও জানা গেছে, একই জেলায় মোট ৪৫ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। বিজিবির টহল দল ও স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিরোধে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি এবং বর্তমানে তারা শূন্যস্থান বা জিরো লাইনে অবস্থান করছে। লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবির কঠোর অবস্থানের মুখে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি এবং তারা ভারতীয় সীমান্তের ভেতরেই অবস্থান করছে।
একই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে বিএসএফ ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৬ শিশুসহ মোট ২৮ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে। বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে সীমান্ত পিলার ২০৩/৬-এস দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বিজিবির বাধায় তা ব্যর্থ হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিএসএফের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখনো ওই ২৮ জন সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ ভেতরে ভারতীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে।
ঝিনাইদহের মহেশপুরে বিজিবির ৫৮ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ যাদবপুর সীমান্ত এলাকায় চার-পাঁচজন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে দেখা গেলে বিজিবি টহল দল তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেয়।
এ ছাড়া, মহেশপুরের সামন্তা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ঘটে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০-৩৫ জনকে সীমান্তে এনে গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালায়। বিজিবি টহল দল ও স্থানীয় জনসাধারণের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকাতেও কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশ-ইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির প্রতিরোধে বিএসএফ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
জয়পুরহাটে বিজিবির ২০ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ জন ব্যক্তিকে একত্র করে পুশ-ইনের প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া যায়। বিজিবির তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির ফলে বিএসএফের ওই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
গত মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল ভোটে জয়ের পর থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজেপি-শাসিত সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী উচ্ছেদের তৎপরতা জোরদার হওয়ার ফলে এসব ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসে জানিয়েছে, দেশটিতে অবৈধভাবে বসবাসরত সন্দেহভাজন ২,৮৬০ জন বাংলাদেশির জাতীয়তা যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশ দাবি করেছে, কোনো তালিকা এখনো তাদের কাছে পৌঁছায়নি। এই জটিলতার মধ্যেই বিএসএফ স্বীয় উদ্যোগে এসব পুশ-ইনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক লোকজন ঠেলে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা নিয়মিত ঘটলেও, ৫ জুন একসঙ্গে এতগুলো অপচেষ্টা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এসব পুশ-ইনের অপচেষ্টা মোকাবিলায় বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং স্থানীয় জনতাকে সঙ্গে নিয়ে পাহারার ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিজিবির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা লঙ্ঘন করে কাউকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আগামী ৮ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য সীমান্ত সম্মেলনে পুশ-ইন, অবৈধ স্থাপনা ও সীমান্ত হত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আনা হবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র। বৈঠকে সম্মেলনের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর চেষ্টা চালানো হবে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।
