×

মতামত

ইরান যুদ্ধ : সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিরোধ ও আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৮:১০ পিএম

ইরান যুদ্ধ : সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিরোধ ও আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস

ইরান যুদ্ধ : সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিরোধ ও আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মদতপুষ্ট ইসরায়েল পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের উপর দ্বিতীয় বারের মতো আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। যুদ্ধের শুরুতেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হন। প্রায় মাসাধিককাল চলা যুদ্ধে রাজধানী তেহরানসহ দেশের শহর-বন্দর, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস-আদালত এবং সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়, যা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এ প্রেক্ষিতে যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের উদ্যোগে উভয়পক্ষ এক পর্যায়ে ৮ এপ্রিল ইরানের ১০-দফা নিয়ে আলোচনায় সম্মত হলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতির অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই আগ্রাসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) এবং ইসরায়েল ‘গর্জনশীল সিংহ-২’ (Operation Roaring Lion-II) নাম দেয়। অপরদিকে ইরান তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের নাম দেয় ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’ (Operation True Promise-IV)।

এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যম, তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মিডিয়া এবং প্রতিপক্ষের প্রচারণা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। প্রকৃত সত্য আড়ালে থাকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক দেশি-বিদেশি প্ল্যাটফর্মও ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। এসব মাধ্যমে যুদ্ধের নানা তথ্য ও মূল্যায়ন সামনে এলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত বাস্তবতা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জনগণের মধ্যে আলোচনা-গবেষণা ও সত্য জানার আগ্রহ থাকলেও তারা বিভ্রান্তির ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে তার সহযোগী ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার কারণ বুঝতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণ সামনে রাখতে হবে। আধুনিক সভ্যতায় পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় সাম্রাজ্যবাদী যুগে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিভিন্ন ধাপ মূল্যায়ন জরুরি। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাপর পরিস্থিতি, সমাজতন্ত্র-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের উত্থান, শীতলযুদ্ধ, বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে একক পরাশক্তি মার্কিন আধিপত্য— এসব বাস্তবতার মধ্যেই ইরানকে বুঝতে হবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। এর পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে বিজয়ী ব্রিটেন-ফ্রান্স বিশ্ববাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টন করে। এই চুক্তির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ নিহিত ছিল। যদিও ইতিহাসে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ ভার্সাই চুক্তির মধ্যেই ছিল, কিন্তু আরব-পারস্য অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সংকটও এর মধ্যেই নিহিত ছিল— এ আলোচনা কমই সামনে আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় ছিল পুঁজিবাদের সাধারণ সংকটের প্রথম পর্যায়। বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরবি, তুর্কি ও ফার্সিভাষী জনগোষ্ঠীর জাতিগত বিভাজন এবং ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘ভাগ কর, শাসন কর’ নীতি কার্যকর করে। ইংরেজরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কিদের বিরুদ্ধে আরবদের ব্যবহার করে এবং পরে আরব উপদ্বীপ ও ট্রান্স-জর্ডান শরিফ হোসেন পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেয়।

অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তুরস্ক ও ইরানে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক ধারা বিস্তারে ভূমিকা রাখে। এর প্রভাবে তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করেন। পরে আরব উপদ্বীপে সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সৌদি শাসকগোষ্ঠী ও হোসেন পরিবারের দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা এখনও বহমান। একই সময়ে প্যালেস্টাইন ও সিরিয়াকে যথাক্রমে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ম্যান্ডেটরি শাসনের অধীনে নেওয়া হয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ১৯২৫ সালে রেজা শাহ পাহলভিকে ইরানের ক্ষমতায় বসায়। পরবর্তীতে জার্মানির প্রভাব বাড়তে থাকলে ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রেজা শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ সালের ৬ মার্চ ইসরায়েল ইরান সরকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন। এর জেরে ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং শাহকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

এদিকে ১৯৪৯ সালে চীন বিপ্লব সফল হয়। উত্তর ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়াতেও সমাজতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে সোভিয়েত নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৫৩ সালে স্টালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন সংকটে পড়ে। এর প্রভাব তুরস্ক ও ইরানেও পড়ে।

১৯৫৭ সালে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের শাহের গোয়েন্দা বাহিনী ‘সাভাক’ (SAVAK) গঠন করে। ১৯৬০ সালে তেহরানে ইসরায়েলি দূতাবাস চালু হয়। ১৯৬৩ সালে শাহ সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিয়াটো, সেন্টো ও আরসিডি জোট গড়ে তোলে।

এর বিরুদ্ধে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইরানে মার্কিনপন্থী শাহ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় বুর্জোয়া ও সামন্তশক্তির আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালের পুরো বছরজুড়ে বিক্ষোভ, দমন-পীড়ন ও গণঅভ্যুত্থান চলতে থাকে। ৮ সেপ্টেম্বরের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’তে সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি শাহ সরকারের পতন ঘটে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি দেশে ফিরে আসেন এবং ইসলামি বিপ্লব বিজয়ী হয়। পরে গণভোটের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৯ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানে তার নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে কমরেড আবদুল হক ইরানের ইসলামিক বিপ্লবকে অসম্পূর্ণ জাতীয় বিপ্লব হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তাঁর মতে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় বিপ্লব সংঘটিত হলেও সামন্তবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি। বিপ্লবের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণি নয়, সামন্ত ও বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল। তবু তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ছাড় দেয়নি।

ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্বাচনভিত্তিক হলেও তা বিশেষ ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়, কিন্তু প্রার্থীদের অনুমোদন দেয় শীর্ষ ধর্মীয় নেতৃত্ব। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে সামরিক কাঠামো। প্রায় ৪ লাখ সদস্যের সেনাবাহিনী ছাড়াও রয়েছে আইআরজিসি (IRGC) ও বাসিজ বাহিনী। ইরানের সামরিক কৌশলে বিকেন্দ্রীভূত ‘মোজাইক কমান্ড ব্যবস্থা’ গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৯ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ পরিচালনা করে আসছে। ১৯৮০ সালে ইরাক ইরানে আক্রমণ চালায়। প্রায় আট বছর যুদ্ধ চলার পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তা শেষ হয়। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা’ ও পারমাণবিক কর্মসূচির অভিযোগ তোলে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শীতলযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। ১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত পতনের পর প্রায় দেড় দশক যুক্তরাষ্ট্র একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পরে রাশিয়া ও চীনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও গভীর হয়। রাশিয়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং চীন জ্বালানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে।

এসসিও, ব্রিকস, বিআরআই ও ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়ায় ইরানের সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মার্কিন-ইসরায়েল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকলেও নেপথ্য সমর্থন তাৎপর্যপূর্ণ।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ তত্ত্ব সামনে আনে। ২০০১ সালে আফগানিস্তান ও ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায়। একই সময়ে ইরান হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি ও ইরাকি প্রতিরোধশক্তিকে সংগঠিত করে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ গড়ে তোলে।

২০০৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরে ২০১৫ সালে JCPOA চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করে। ২০২৪ সালে দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে আইআরজিসির কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়। এর জবাবে ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-১’ চালায়। পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধ ও হামাস নেতাদের হত্যাকাণ্ডের জেরে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-২’ সংঘটিত হয়।

২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে ইরানে হামলা চালায়। এতে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা নিহত হন। জবাবে ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৩’ শুরু করে। ১৬ জুন ইরান প্রথমবারের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ’ ব্যবহার করে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের আয়রন ডোম ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে তেলআবিব, হাইফা, মোসাদ সদরদপ্তর ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধকে ঘিরে প্রচারযুদ্ধও তীব্র আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় প্রকৃত সত্যকে শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন জরুরি। ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ পুঁজিবাদী বা সামন্তবাদী রাষ্ট্র নয়; বরং সামন্ত ও বুর্জোয়া ব্যবস্থার মিশ্রণভিত্তিক বহুজাতিক রাষ্ট্র। ফার্সিদের পাশাপাশি বালুচ, কুর্দি ও আজারবাইজানিরা সেখানে বসবাস করে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ইহুদি সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও রয়েছে। শাহ আমলে তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত শক্তিশালী হয়, যা মোসাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারে সহায়ক হয়।

ইরানের যুদ্ধকৌশল মূলত আত্মরক্ষাভিত্তিক প্রতিরোধ যুদ্ধ। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এর প্রতিটি ধাপে ইরান শত্রুর আক্রমণের জবাব দিয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ে ইরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক কৌশলে যায়। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা এবং জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএস জেরাল্ড ফোর্ডকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হয়। মার্কিন নৌ-শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এতে প্রশ্নের মুখে পড়ে। একইসঙ্গে ইরান উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতা ভাবতে বাধ্য করে।

কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি, বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান, ইউএইর আল-দারফা, জর্ডান ও সৌদি আরবের ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ২৭টি মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহারের লক্ষ্য সামনে আসে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংসের দাবি ইরানি জনগণকে উৎসাহিত করে এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে পড়ে।

বর্তমান যুদ্ধ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বিশ্বে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা তীব্র। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে। চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে ডি-ডলারাইজেশন, ব্রিকস, সিপস (CIPS), স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, পেট্রোডলার চুক্তির অবসান এবং সোনার মজুদ বৃদ্ধি— এসব পদক্ষেপ বিশ্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিপুল বাজেট ও বাণিজ্য ঘাটতির মুখে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মিত্রদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করছে। ন্যাটো নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইউরোপের বিকল্প জোটের চিন্তা এবং ফ্রান্সের স্বাধীন অবস্থান বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতাকে সামনে আনছে।

তবে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের বাস্তবতা কখনোই জনগণের মুক্তির সমার্থক নয়। একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব বিস্তারের লড়াই— উভয়ই বিশ্ব জনগণকে সংঘাত ও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বৃহত্তর দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই এই যুদ্ধকে কেবল ধর্মীয় বা আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদী সংকট, বাজার ও প্রভাববলয় পুনর্বণ্টনের আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী সংঘর্ষ এবং প্রতিরোধ রাজনীতির ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই বিচার করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষোভ, স্কুলের চেয়ারম্যানকে মারধর

ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষোভ, স্কুলের চেয়ারম্যানকে মারধর

খণ্ডিত লাশ উদ্ধার, প্রবাসীকে হত্যার দায় স্বীকার প্রেমিকার

খণ্ডিত লাশ উদ্ধার, প্রবাসীকে হত্যার দায় স্বীকার প্রেমিকার

সাদিও মানেকে নিয়ে সেনেগালের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

সাদিও মানেকে নিয়ে সেনেগালের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

দুই মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন স্থগিত

দুই মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন স্থগিত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App