×

বিশেষ সংখ্যা

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন

তিলোত্তমা ঢাকায় মাত্র দুটি ঈদগাহ

Icon

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ১১:২২ পিএম

তিলোত্তমা ঢাকায় মাত্র দুটি ঈদগাহ

তিলোত্তমা ঢাকায় মাত্র দুটি ঈদগাহ

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মসজিদ আর খেলার মাঠে তাৎক্ষণিক জায়গা করে প্রতিবছরই অনুষ্ঠিত হয় ইসলাম ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ঈদের নামাজের জামাত। যে কারণে ঢাকার অনেক প্রজন্মই জানে না ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ার স্বাদ। জানবে কী করে- ঈদগাহ বলতে যা বোঝায় তা এই তিলোত্তমা ঢাকায় আছে মাত্র দুটি। এর একটি মোঘল আমলের ‘শাহী ঈদগাহ’ এবং অন্যটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় একযুগেরও বেশি সময় পরের তৈরী আমাদের জাতীয় ঈদগাহ।

‘ঈদগাহ’ হলো খোলা আকাশের নিচে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার নামাজ পড়ার স্থান। শরীয়তের বিধান মতে ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। ইসলামি চিন্তাবিদগণ মত প্রকাশ করেন— যদি ঈদগাহের দূরত্ব অনেক বেশি হয় অথবা কেউ বৃদ্ধ বা অসুস্থ থাকেন তাহলে নিকটস্থ মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন। যে কারণেই ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ার আনন্দটা একটু অন্যরকম।

এই অন্যরকম আনন্দের স্বাদ নিতেই হয়তো সম্রাট শাহজাহানের ছেলে ও তৎকালীন বাংলার সুবাদার রাজপুত্র শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৪০ সালের দিকে বর্তমান ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত আদিকালের ‘ঢাকা ঈদগাহ’ বা এখনকার ‘শাহী ঈদগাহ’টি নির্মাণ করেছিলেন তার দেওয়ান মীর আবুল কাশিম। ঈদগাহটি আশপাশের ভূমি থেকে প্রায় ১.৮৩ মিটার (৬ ফুট) উঁচু একটি আয়তাকার উন্মুক্ত চত্বর। আদি ঈদগাহ চত্বরের পরিমাপ ছিল ৭৪.৬৮ দ্ধ ৪১.৭৬ মিটার। প্রথম অবস্থায় ঈদগাহের বেষ্টন-প্রাচীরের উচ্চতা ছিল ৪.৫৭ মিটার (১৫ ফুট)। ঈদগাহের পশ্চিম দেয়ালে কেন্দ্রীয় মিহরাব এবং এর দু’পাশে তিনটি করে অপেক্ষাকৃত ছোট মিহরাব আছে। অর্ধ-অষ্টভুজাকৃতির কেন্দ্রীয় মিহরাবে রয়েছে চতুঃকেন্দ্রিক সামান্য ঢালু খিলান।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ৪৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো এ ঈদগাহে নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে বসতো মেলার আয়োজন। যদিও শুরুর দিকে এই ঈদগাহে কেবল সে সময়ের ধনীরাই নামাজ পড়তে পারতো। তবুও সেখানে নানান শ্রেণীপেশার মানুষের সমাগমে সৃষ্টি হতো উৎসবের আমেজ। পরে নায়েব-নাজিম এবং পঞ্চায়েত সর্দারদের আমল থেকে এই উৎসব সর্বজনীন হতে শুরু করে। ঢাকায় ঈদ উৎসব নিয়ে ঐতিহাসিক মির্জা নাথান তার গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান ই-গায়বী’তে বলেছেন- “রমজান মাসের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন বন্ধুবান্ধব পরস্পর মিলিত হতো পরস্পরের তাঁবুতে। এটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ এক রীতি।”

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা সমগ্র-১’ থেকে জানা যায়- ‘ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থিত ঈদগাহ ময়দানটি আশপাশ থেকে বেশ উঁচু। প্রতি বছর এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ জামাত উপলক্ষ্যে ধানমন্ডিতে ঈদের মেলা বসতো। আশরাফ-উজ-জামান তার আত্মজীবনীমূলক এক নিবন্ধে ঈদ মেলার কথা উল্লেখ করেছেন।’

তিনি লিখেছেন, ‘ঈদের মেলা হ’ত চকবাজারে এবং রমনা ময়দানেও। বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত নানা রকমের। কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হ’ত বিকেল বেলা।’

এছাড়া ঢাকার ঈদ আনন্দে ঈদ মিছিল একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতি ছিল। মিছিলে গাওয়া হতো এক প্রকার বিশেষ সংগীত। এটাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কাসিদা’ বলা হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকেও শহরের মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়তেন এই ঈদগাহে এবং মেলার আয়োজন করা হতো।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়- ধানমন্ডির এই ‘শাহী ঈদগাহ’ বা আদিকালের ‘ঢাকা ঈদগাহ’র পাশ দিয়ে একসময় কলকল করে বয়ে যেত পন্ডু নদীর একটি শাখা। এই শাখা নদী মোহাম্মদপুরের সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে মিলিত হতো বুড়িগঙ্গার সঙ্গে। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত ইমারত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ঈদগাহসংলগ্ন মসজিদটি বর্তমানে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আছে। তবে এর একটা অংশ চলে গেছে মাদ্রাসা এবং নতুন মসজিদের দখলে।

অন্যদিকে, বর্তমানের সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে অবস্থিত জাতীয় ঈদগাহ তৈরি হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে। এর আগে এখানে ঝোপ-ঝাড়ে ঘেরা বিশাল পুকুর ছিল। ১৯৮১-৮২ সালের দিকে সেই ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। পরে এখানে ছোট পরিসরে শামিয়ানা টানিয়ে ঈদের নামাজ পড়ানো শুরু হয়। এর পরে ১৯৮৫ সালের দিকে সেই পুকুরটি ভরাট করা হয়। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে ওই ঈদগাহকে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এ ঈদগাহে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রসাশনিক ব্যক্তিবর্গ রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, রাজনীতিক, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নানা বয়সী মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করে থাকেন। এখানে একসঙ্গে প্রায় ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। এছাড়াও এখানে একই জামাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য থাকে ভিন্ন ব্যবস্থা।

নথি-পত্র ঘেঁটে জানা যায়- জাতীয় ঈদগাহ মাঠের আয়তন ২ লাখ ৭০ হাজার ২৭৭ বর্গফুটের বেশি। এই ঈদগাহের কিবলার দিকে রয়েছে পাঁচটি মিনারের একটি মিহরাব। বর্তমানে হাইকোর্টের অধীনে ঈদগাহটি পরিচালিত হলেও ঈদগাহটির দেখভাল করে গণপূর্ত বিভাগ। ২০০০ সালে দুই ঈদেই ঈদগাহ প্রস্তুতের দায়িত্ব পায় ঢাকা সিটি করপোরেশন।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভোরের কাগজের ঈদ আয়োজন

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ ভোরের কাগজের ঈদ আয়োজন

সেই ঈদ কি এখনো আসে...

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন : সম্পাদকীয় সেই ঈদ কি এখনো আসে...

রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

শুভ নাকি অশুভ?

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন শুভ নাকি অশুভ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App