×

বিশেষ সংখ্যা

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন

রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর। দিনটি ছিল পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। একটি স্বাধীন দেশে উৎসবের এই দিনটি তখনকার বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছিল একেবারেই অন্য রকম। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পূর্ণ হতে না হতেই এই ঈদ এসেছিল বাঙালির ঘরে ঘরে, কিন্তু সঙ্গে এনেছিল গভীর বেদনা, আত্মত্যাগের দৃপ্ত শপথ, আর এক টুকরো স্বাধীন ভূখণ্ডের অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা। এই দিনটি যেন একই সঙ্গে ছিল চরম বেদনা আর অবিচল বিশ্বাসের এক অধ্যায় ।

ভিন্ন এক ঈদের সকাল

একটি স্বাভাবিক ঈদের সকাল যেমন উচ্ছ্বাস, নতুন জামা, সেমাই-পোলাওয়ের গন্ধ আর আনন্দে ভরপুর থাকে, ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের জীবনে ঈদ মানে ছিল শুধুই ফাঁকা রাস্তা আর মৃত্যুর আতঙ্ক।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার বিখ্যাত ডায়েরি 'একাত্তরের দিনগুলি'তে লিখেছেন, ‘টেবিলের ওপর আতরের শিশি রাখা হয়নি। শরীফ, জামি ঈদের নামাজ পড়তে যায়নি। তারপরও ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি জর্দা আর সেমাই রেঁধেছি। যদি রুমির বন্ধুরা কেউ আসে? যদি কোনো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আসে বাবা-মা-ভাইবোনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, রাতে অন্ধকারে? তাদের খাওয়ানোর জন্য আমি পোলাও-কোরমা, কোফতা-কাবাব রেঁধেছি। কেউ এলে নিজের হাতে তাদের পরিবেশন করব। তাদের জামায় আতর দিয়ে দেবার জন্য একটা শিশি আতরও লুকিয়ে রেখেছি।’

শহীদ জননীর এই লেখনি স্পষ্ট করে দেয়, যুদ্ধের সময়ে ঈদের আনন্দ কেমন করে বাঙালি পরিবার থেকে হারিয়ে গিয়েছিল ।

সাংবাদিক ও লেখক আবু জাফর শামসুদ্দিন তখন ঢাকায় ছিলেন। তিনিও লিখেছেন, জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি ঈদের নামাজে যাননি। তার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, শহর তখন কেমন স্তব্ধ ছিল- ‘রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনীর ট্রাক। ফিরে আসার পথে দেখি, বায়তুল মোকাররম মসজিদে ঈদের জামাত হচ্ছে, কিন্তু চারদিকে সেনাবাহিনীর কড়া পাহারা। আমার পুরো জীবনে এটাই প্রথম ঈদ, যখন আমি ঈদের নামাজ পড়তে পারিনি।’

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রচারণা চালিয়েছিল- ‘ঈদুল ফিতর পূর্ব পাকিস্তানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদযাপিত হয়েছে’। এমনকি ২৩ নভেম্বর ইত্তেফাক পত্রিকায় 'ঈদ জামাত আউটার স্টেডিয়ামে' শিরোনামে গভর্নর এম এ মালেকের নামাজ পড়ার ছবিও ছাপা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ।

মুজিবনগরে ঈদ: একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন

ঠিক তখনই কলকাতার থিয়েটার রোডে অবস্থিত মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সদর দপ্তরের ছোট্ট লনে পালিত হচ্ছিল আরেকটি ঈদ। এই ঈদের জামাতে অংশ নিয়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। 

এই জামাতের আয়োজন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান সরকার বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে 'ইসলাম-বিরোধী' হিসেবে প্রচার করছিল। মুজিবনগর সরকারের এই ঈদ জামাত ছিল তার জবাব। এটি প্রমাণ করেছিলো যে, এই লড়াই ছিল একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির মুক্তির লড়াই ।

ঈদ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বদেশবাসীকে জানিয়েছিলেন- ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, দেশকে শত্রুমুক্ত করে আমরা ঈদুল ফাতেহ বা বিজয়ের ঈদ উদযাপন করব। আর সেটা বেশি দূরে নয়।’

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার বাণীতে বলেছিলেন- ‘এবারের ঈদের আনন্দ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আছে কেবল স্বজন হারানোর বেদনা, সংগ্রামে জয়ের দৃপ্ত অঙ্গীকার ও আত্মত্যাগের ব্রত। শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা যেদিন একত্রে ঈদ উদযাপন করব, সেদিনই আমাদের কেড়ে নেওয়া আনন্দ ফিরে পাব। মুক্তির লড়াইয়ের সফলতা এখন খুব কাছে। আসুন, সবাই সেই দিনকে কাছে আনার জন্য প্রার্থনা ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা চালাই।’ 

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঈদের দিনই রাতের অন্ধকারে সীমান্ত অতিক্রম করে কুষ্টিয়ার একটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাঠানো মিষ্টি তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। এক আবেগঘন মুহূর্তে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বলেছিলেন-  ‘আমি দোষটা ভুলে গিয়ে শুধু দেখতে চেয়েছি যে, কী কী অভাব তোমাদের। আজ আমি এখানে এসেছি আমার মাতৃভূমির ধূলিমাখা পায়ের তলার মাটি স্পর্শ করে শপথ নিতে, এই প্রতিশ্রুতি যেন না ভুলি।’

একই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরেও ঈদ পালিত হয়েছিলো। বিখ্যাত আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান তোলা ছবিতে দেখা যায়, ভারতের নদীয়ার শিকারপুরে একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ২০ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের মহড়ার দৃশ্য। উৎসবের দিনেও তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই— কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করা ।

যুদ্ধক্ষেত্রে ঈদ: আত্মত্যাগের মহিমা

এই ঈদের দিনটি শুধু কান্না আর শপথের ছিল না, ছিল আত্মত্যাগেরও। সারাদেশেই যুদ্ধ চলছিল। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর রায়গঞ্জে পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে এলাকা মুক্ত করতে গিয়ে শহীদ হন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ (বীর উত্তম)।  ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ চলে ঈদের দিন ২০ নভেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত। তার বীরত্বে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের পাঁচ মাইল পিছু হটতে বাধ্য করেছিল ।

ঈদের রাতটিও ছিল ভয়াবহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে আটক ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পয়রাতলা খালপাড় এলাকায় নিয়ে ঈদের রাতেই হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। ঈদের ভোরে তাদের মরদেহ ভেসে ওঠে খালের পানিতে ।

এছাড়া নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ, সাতক্ষীরার তালায় যুদ্ধ, সিলেটের জকিগঞ্জ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—সবকিছুই চলেছে ঈদের দিনে। রক্তে ভেসে গিয়েছিলো ঈদের আনন্দ ।

বেদনার ঈদ, বিজয়ের গান

এমন বেদনার দিনেও আশার আলো ছড়িয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে এই বেতার কেন্দ্র থেকে ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। সারা দিন বাজে হৃদয়ছোঁয়া একটি গান— ‘ঈদের চাঁদ যেন ফিরে যেতে বাধ্য হলো, এমন ঘটনা আর কোথাও হয়েছে বলে জানা নেই।’ 

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর ‘আমার একাত্তর’ বইয়ে সেদিনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, ঈদের আগের দিন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাকে ডেকে পাঠান। যুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধীর সফর নিয়ে আলাপের শেষে তিনি তার রুম থেকে একটি খাম এনে অধ্যাপককে দেন। টাকার খাম দেখে আনিসুজ্জামান জিজ্ঞেস করলে প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন- ‘ঈদ আসছে, এটা সেজন্য।’ 

সেই খামে ৫০০ টাকা ছিল, যা ছিলো তার এক মাসের বেতনের সমান। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘আমি টাকা নিতে চাইছিলাম না। তিনি বললেন-মতোমার বাচ্চাদের আমি ঈদ উপহার তো দিতে পারি? অনেক আবেগ নিয়ে তিনি কথা বললেন। আমি আর তর্ক করতে পারলাম না।’

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বরের ঈদ বাঙালি জাতিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হয়। এটি ছিল আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে আনন্দ নয়, চোখের অশ্রু ছিলো ঈদ-আবেগের আত্মপ্রকাশ। কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকানো ছিল এক অনির্বাণ বিশ্বাস— আগামী ঈদ হবে স্বাধীন বাংলাদেশে। আর সেটাই ঘটেছিল। 

মাত্র ২৬ দিন পরেই ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। আর তার পরের ঈদ-উল-আজহা, ১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মাত্র আড়াই সপ্তাহ আগে (১০ জানুয়ারি) স্বদেশে ফেরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন ধানমন্ডি ক্লাব মাঠে । তাঁকে একনজর দেখার জন্য সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেতও হয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পেয়েছিল তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘বিজয়ের ঈদ’।

লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভোরের কাগজের ঈদ আয়োজন

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ ভোরের কাগজের ঈদ আয়োজন

সেই ঈদ কি এখনো আসে...

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন : সম্পাদকীয় সেই ঈদ কি এখনো আসে...

রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন রক্ত-অশ্রু-বেদনায় ভরা বাঙালির সেই ঈদ

শুভ নাকি অশুভ?

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন শুভ নাকি অশুভ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App