×

মুক্তচিন্তা

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শিল্পখাতের আসল প্রতিযোগিতা

Icon

সাকিফ শামীম, অর্থনীতিবিদ

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শিল্পখাতের আসল প্রতিযোগিতা

ছবি: সাকিফ শামীম, অর্থনীতিবিদ

টেক্সটাইল, প্লাস্টিক না ই-ওয়েস্ট—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পের নেতৃত্ব কার হাতে? বর্তমান সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং টেকসই শিল্পায়নের পথে তিন খাতের বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশের শিল্পায়নের বর্তমান ধারা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—দেশটি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ঐতিহ্যগত রপ্তানিনির্ভর টেক্সটাইল খাত, অন্যদিকে দ্রুত বিকাশমান প্লাস্টিক শিল্প এবং নতুন উদীয়মান ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনা—এই তিনটি খাতই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এই তিনটি খাতের তুলনামূলক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন উঠে আসে: কোন খাতটি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত?

বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। শক্তিশালী রপ্তানি বাজার, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং তুলনামূলকভাবে উন্নত উৎপাদন অবকাঠামো এই খাতকে একটি সুসংগঠিত অবস্থানে নিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, গ্রিন ফ্যাক্টরি এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের মাধ্যমে এই খাত টেকসইতার দিকেও অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির পরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে—উচ্চমূল্য সংযোজন, ডিজাইন সক্ষমতা এবং গবেষণা-নির্ভর উদ্ভাবনের ঘাটতি। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই খাতকে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের দিকে যেতে হবে।

প্লাস্টিক শিল্প বাংলাদেশের একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত, যা স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করছে। প্যাকেজিং ও ভোক্তা পণ্যে এর ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে শিল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং এই বাস্তবতায় টেকসই উৎপাদন ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের রিসাইক্লিং ব্যবস্থার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা একটি সংগঠিত সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলার পথে বড় বাধা। এই খাতে প্রযুক্তি, নীতি এবং বিনিয়োগ—তিনটির সমন্বয় জরুরি।

অন্যদিকে, ই-ওয়েস্ট খাতটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একদিকে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে, অন্যদিকে মূল্যবান সম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগও সৃষ্টি করছে। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে রূপান্তর করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এই খাতটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে পিছিয়ে রয়েছে—নিয়ন্ত্রিত সংগ্রহ, নিরাপদ পুনর্ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। ফলে সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতকে ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।

তিনটি খাতের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান বাস্তবতায় টেক্সটাইল খাত সবচেয়ে প্রস্তুত, কারণ এর রয়েছে সুসংগঠিত কাঠামো ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার। তবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিক থেকে ই-ওয়েস্ট খাত সবচেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে, যদি এটি প্রযুক্তিনির্ভর ও নীতিগতভাবে সমর্থিত একটি শিল্পে রূপান্তরিত করা যায়। প্লাস্টিক খাত এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও টেকসইতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য।

আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের শিল্প নীতিতে এখন একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। টেক্সটাইল খাতকে উচ্চমূল্য সংযোজন ও উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যেতে হবে, প্লাস্টিক খাতকে সার্কুলার ইকোনমির কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে, এবং ই-ওয়েস্ট খাতকে একটি আনুষ্ঠানিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। এই তিনটি খাতই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—যদি আমরা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

এছাড়া বাংলাদেশের শিল্পখাতে টেকসই রূপান্তর নিশ্চিত করতে ক্লিন টেকনোলজি গ্রহণ এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। টেক্সটাইল খাতে পানি ও কেমিক্যাল ব্যবহারে দক্ষ প্রযুক্তি, প্লাস্টিক খাতে বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ এবং ই-ওয়েস্ট খাতে আধুনিক রিসাইক্লিং প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশগত চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ট্যাক্স রিবেট, স্বল্পসুদে গ্রিন ফাইন্যান্সিং এবং প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে শিল্পগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রিন সার্টিফিকেশন অর্জনে সহায়তা দিলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতাও বাড়বে।

টেকসই শিল্পায়নের জন্য একটি কার্যকর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্লাস্টিক ও ই-ওয়েস্ট খাতে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে একটি সংগঠিত, ট্রেসেবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। “Extended Producer Responsibility (EPR)” নীতির মাধ্যমে উৎপাদকদেরই তাদের পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল করা যেতে পারে। একইসাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) ভিত্তিতে রিসাইক্লিং হাব ও বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করলে একটি কার্যকর সার্কুলার ইকোনমি গড়ে উঠবে, যেখানে বর্জ্যই পরিণত হবে নতুন সম্পদে।

সবচেয়ে প্রস্তুত খাত নির্ধারণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমরা কোন খাতগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারছি। কারণ আজকের প্রতিযোগিতা কেবল উৎপাদনে নয়, বরং টেকসইতা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

হাওরের বাঁধ ভেঙে ৯ হাজার হেক্টর ধান পানির নিচে

হাওরের বাঁধ ভেঙে ৯ হাজার হেক্টর ধান পানির নিচে

রাজধানী থেকে ফেনীতে সাবেক চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

রাজধানী থেকে ফেনীতে সাবেক চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

ভারত থেকে আরো ৮ হাজার টন ডিজেল এসেছে

ভারত থেকে আরো ৮ হাজার টন ডিজেল এসেছে

৫ লাখ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের

৫ লাখ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App