×

মুক্তচিন্তা

ন্যারেটিভের রাজনীতি: মানুষ কি বাস্তবতাকে দেখে, নাকি গল্পকে?

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

ন্যারেটিভের রাজনীতি: মানুষ কি বাস্তবতাকে দেখে, নাকি গল্পকে?

ছবি: এআই নির্মিত

রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর একটি দৃশ্য অনেককে বিস্মিত করেছে। তাঁর জানাজা নিয়ে নানা বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যেও বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। একই সময়ে অনলাইন পরিসরে তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য নেতিবাচক বয়ানও ছড়িয়ে পড়েছে।

দুটি দৃশ্য যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। একদিকে বাস্তবের জনসমাগম, অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতের তীব্র বিরোধিতা। প্রশ্ন হলো, কোনটি সত্য? মানুষের আচরণকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? সম্ভবত উত্তরটি রাজনীতির চেয়ে গভীর; এটি মানুষের সামাজিক ও মানসিক গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ রবিন ডানবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছিলেন, যা 'ডানবার নাম্বার' নামে পরিচিত। তাঁর মতে, একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৫০ জনের সঙ্গে স্থায়ী ও অর্থবহ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। এই সীমার মধ্যে আস্থা তৈরি হয় প্রত্যক্ষ পরিচয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ভিত্তিতে।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক দল বা জাতি তো কয়েকশ মানুষের সমষ্টি নয়; বরং লাখো-কোটি মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। সেখানে সবাই সবাইকে চেনে না, যাচাইও করতে পারে না। ফলে বৃহৎ সমাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয় এমন এক বন্ধনের, যা ব্যক্তিগত পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করতে পারে।

ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করেছেন shared story বা 'সম্মিলিত কাহিনি'র ধারণার মাধ্যমে। তাঁর মতে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এমন কিছুকে সম্মিলিতভাবে বিশ্বাস করার ক্ষমতা, যা কেবল বস্তুগত বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র, জাতি, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, বিপ্লব, উন্নয়ন কিংবা ন্যায়বিচার— এসবই এক ধরনের সামাজিক কাহিনি, যা মানুষকে একটি বৃহত্তর সমষ্টির অংশ হতে সাহায্য করে। রাজনীতির ভাষায় এই কাহিনির আরেক নাম— ন্যারেটিভ।

একটি রাজনৈতিক দল যখন ছোট থাকে, তখন তাকে ধরে রাখে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। কিন্তু যখন সেই দল লক্ষ মানুষের সংগঠনে পরিণত হয়, তখন তাকে ধরে রাখে একটি যৌথ বয়ান। আমরা কারা, কেন একত্রিত, আমাদের সংগ্রাম কী, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়— এই প্রশ্নগুলোর একটি অভিন্ন উত্তরই রাজনৈতিক ন্যারেটিভের ভিত্তি। এই কারণেই রাজনীতি শুধু সংগঠন বা নেতৃত্বের খেলা নয়; এটি গল্পেরও খেলা।

মানুষ সাধারণত সব তথ্য জানে না। অধিকাংশ রাজনৈতিক ঘটনা সে প্রত্যক্ষভাবে দেখেও না। ফলে বাস্তবতাকে বুঝতে মানুষ বিভিন্ন বয়ান, প্রতীক, স্মৃতি এবং সামাজিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোও তাই কেবল ঘটনা ঘটায় না; ঘটনার অর্থ নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। একই ঘটনাকে কেউ মুক্তির সংগ্রাম বলে, কেউ বিশৃঙ্খলা বলে। কেউ উন্নয়ন বলে, কেউ বৈষম্য বলে। কেউ ইতিহাস রক্ষা বলে, কেউ ইতিহাসের অপব্যবহার বলে। বাস্তব ঘটনা একটিই, কিন্তু তার ব্যাখ্যা একাধিক। এখানেই ন্যারেটিভের শক্তি। তবে ন্যারেটিভের শক্তিই তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও।

কারণ কোনো ন্যারেটিভ যখন বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে বাস্তবতাকে আড়াল করতে শুরু করে, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যখন রাজনৈতিক আনুগত্য সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন মানুষ তথ্য নয়, নিজের পছন্দের গল্পকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তখন ভিন্নমত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রুতে পরিণত হয়। যুক্তির জায়গা দখল করে আবেগ; সংলাপের জায়গা দখল করে অবিশ্বাস।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মেরুকরণের পেছনে এই প্রবণতা স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগে মানুষ একটি ঘটনা জানত, তারপর মত গঠন করত। এখন অনেক সময় মানুষ আগে মত গঠন করে, তারপর নিজের মতের পক্ষে তথ্য খুঁজে নেয়। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে ঘিরে একাধিক ন্যারেটিভ তৈরি হয়। কখনো ব্যক্তি, কখনো প্রতিষ্ঠান, কখনো রাজনৈতিক দল— সবকিছুই বয়ানের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ বাস্তবতা ক্রমশ ব্যাখ্যার ভিড়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য কখনো বদলায় না।

কোনো ন্যারেটিভ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না যদি তা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। কর্মসংস্থান না থাকলে উন্নয়নের গল্প দুর্বল হয়ে যায়। ন্যায়বিচার অনুপস্থিত থাকলে ন্যায়ের বয়ান বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। নাগরিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে গণতন্ত্রের ভাষণও মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাই ন্যারেটিভের বিচারক।

এই কারণেই রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য স্লোগান, প্রতীক ও বয়ান হারিয়ে গেছে; কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদা অপরিবর্তিত থেকেছে। মানুষ শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক জীবন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ চায়। যে রাজনৈতিক শক্তি এসব নিশ্চিত করতে পারে, তার ন্যারেটিভও শক্তিশালী হয়। আর যে শক্তি পারে না, তার সবচেয়ে দক্ষ প্রচারণাও একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে।

তোফায়েল আহমেদের জানাজাকে ঘিরে দেখা দৃশ্যটি তাই কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে প্রতিক্রিয়ার প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের সময়ের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে একই ব্যক্তি একই সময়ে কারও কাছে ইতিহাসের অংশ, কারও কাছে বিতর্কের প্রতীক; একই ঘটনা কারও কাছে অর্জন, কারও কাছে ব্যর্থতা।

এই দ্বৈত বাস্তবতার যুগে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ হলো কোনো ন্যারেটিভকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং তার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব পরিমাপ করা। কারণ গল্প মানুষকে আন্দোলিত করতে পারে, সংগঠিত করতে পারে, এমনকি ইতিহাসও বদলে দিতে পারে। কিন্তু কোনো গল্পই বাস্তবতার বিকল্প নয়।

শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ বয়ান, সবচেয়ে দক্ষ প্রচারণা কিংবা সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান। টিকে থাকে সেই ন্যারেটিভ, যার পেছনে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচারের অনুভূতি এবং দৃশ্যমান অর্জনের ভিত্তি থাকে। রাজনীতির ইতিহাস শেষ পর্যন্ত গল্পের নয়, বাস্তবতার কাছেই জবাবদিহি করে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মৃত ভেবে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি, ছয় দিন পর জীবিত ফিরলেন এভারেস্ট গাইড

মৃত ভেবে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি, ছয় দিন পর জীবিত ফিরলেন এভারেস্ট গাইড

বজ্রপাতে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু

বজ্রপাতে কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু

প্রাইভেট কারের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু

প্রাইভেট কারের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু

অটোরিকশার ধাক্কায় স্কুলছাত্র নিহত

অটোরিকশার ধাক্কায় স্কুলছাত্র নিহত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App