বাজেট ভাবনা
বরাদ্দ বাড়ালেই কি স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা মিটবে?
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়বে, এ তথ্য মোটামুটি নিশ্চিত। অর্থমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের অনেকেই বিভিন্ন সময় এ তথ্য জানিয়েছেন। বুধবার (১৩ মে) আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আসন্ন বাজেটে এ খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হবে। যা গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল বরাদ্দের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ইতোমধ্যে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (প্রাইমারি হেলথকেয়ার) ব্যবস্থাকে সমন্বিত ও কার্যকর কাঠামোয় রূপ দিতে কাজ শুরু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ কথা থাকলেও বাংলাদেশে বরাদ্দ ৫ শতাংশের কাছাকাছি। আবার দেখা যাচ্ছে নানা কারণে এই ৫ শতাংশ বরাদ্দের একটা বড় অংশ খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইটেম অনুযায়ী বাজেট হওয়ায় এ সমস্যা হয়।
জানা যায়, অর্থ বিভাগের প্রাথমিক প্রস্তাবে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও সর্বজনীন সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে মোট ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই বরাদ্দ বাড়ানোর পেছনে সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে : তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। বরং সঠিক উপায়ে এটি খরচ করতে হবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, বাস্তবায়নের মান, তদারকি ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করে দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই প্রকৃত সুফল আসবে।
তারা বলছেন, বাজেট খরচ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ খালি থাকা। বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণির মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, চতুর্থ শ্রেণির পদ খালি। হাসপাতালগুলোতে মেশিন থাকলে মেশিন চালানোর মতো লোকবল নেই, আবার কিছু ক্ষেত্রে মেশিন চালানোর লোক আছে, কিন্তু মেশিন নেই। এই যে শূন্যটা তা পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেশিন কেনার পাশাপাশি সেগুলো চালানোর জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে, যেখানে লোকবল বেশি প্রয়োজন সেখানেই পদ খালি পড়ে আছে। এটা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা। তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণ চাহিদা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার অভাবও এর জন্য দায়ী। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতে নীতিনির্ধারকদের বড় ধরনের দ্বিধার বিষয়টিও এখানে জড়িত।
অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোথায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। একদিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে ডায়ালাইসিস, আইসিইউর মতো ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাও জরুরি। কিন্তু সব চাহিদা একসঙ্গে পূরণ করা বাস্তবে সম্ভব নয়। অর্থনীতির ভাষায় এটিই ‘ট্রেড-অফ’। আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সবাই বলতে পারে দুটোই করতে হবে। কিন্তু সীমিত সম্পদের কারণে সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতেই হয়। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত।
স্বাস্থ্য খাতের অর্থ ব্যয় করতে না পারার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সিনিয়র সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, সরকার আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছে। এ বরাদ্দ বাড়ানো নিয়ে আমরা যতটা না উদ্বেলিত, তার চেয়ে বেশি শঙ্কিত। বছর শেষে এ ব্যয় ফিরে যায় কিনা, তা আমরা জানি না। কারণ, বছর বছর আমরা এ চর্চাই দেখে এসেছি। এছাড়া এ বাড়তি ব্যয় কোন কোন খাতে হবে, সেটাও জানানো জরুরি।
কমাতে হবে ব্যক্তির ব্যয়
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে জনগণের নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহনের হার অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা এখনো বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তির পকেট থেকে যাচ্ছে। গরিব মানুষের মোট আয়ের ৩৫ শতাংশই যায় চিকিৎসায়। ক্যান্সার কিংবা কিডনি রোগের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির বড় ব্যয়ের কারণে বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নেমে গেছে। অসংখ্য পরিবার আছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরোর ২০২২ সালে পরিচালিত সর্বশেষ আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য পর্যালোচনা ও নতুন করে ৬২ হাজার ৩৮৭ জনের ওপর স্বাস্থ্যবিষয়ক চাহিদা ও চিকিৎসার উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যেমে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৯৭ সালে চিকিৎসায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয়ের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বাকিটা রাষ্ট্র ব্যয় করত। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
স্বাস্থ্য খাতের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিআইডিএসের গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এছাড়া স্বাস্থ্য বিমাভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার।
অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচ যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্যও তত বাড়বে। অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ানো গেলে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি উপকৃত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি বলেন, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচের হার যত বেশি হবে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও তত বাড়বে। কারণ সমাজে আয়ের বৈষম্যের তুলনায় স্বাস্থ্য খরচের বৈষম্য আরো বেশি প্রকট। এ কারণে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো উচ্চতর সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে বৈষম্য রয়ে গেছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো বৈষম্য কমাতে সহায়ক। স্বাস্থ্যসেবায় প্রাইভেট সেক্টরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় কাছাকাছি হলেও ভিয়েতনামে সরকারি ব্যয়ের অনুপাত বেশি থাকায় দেশটি স্বাস্থ্য সূচকে এগিয়ে গেছে।
স্বাস্থ্যসেবা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক, আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে হবে
প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা এখনো ঢাকা বা বড় বড় শহরকেন্দ্রিক। বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং চিকিৎসাসেবার সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র বেশ স্পষ্ট।
বিআইডিএসের গবেষণায়ও চিকিৎসাসেবায় আঞ্চলিক বৈষম্যচিত্রটি উঠে এসেছে। জরিপকালে ৬৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, চিকিৎসার চাহিদা পূরণ হয়নি। চিকিৎসা বঞ্চিতদের মধ্যে গ্রাম-শহর ব্যবধানও বেশ স্পষ্ট। গ্রামের ৬৮ শতাংশের বিপরীতে শহরের ৫৯ শতাংশ রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন অপূরণীয় থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগে চিকিৎসা না পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৭৩ শতাংশ। সিলেটে এ হার ৭০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে চট্টগ্রামে তুলনামূলক কম, প্রায় ৫১ শতাংশ। জেলাভিত্তিক চিত্র আরো উদ্বেগজনক। নড়াইলে অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদার হার ৮১ শতাংশ। বিপরীতে ফেনীতে এ হার সবচেয়ে কম, ১৮ শতাংশ।
চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণ না হলে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে রোগীর চাপ বাড়বে। সেবা থেকে বঞ্চিত হবে রোগীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা; জেলা হাসপাতালগুলোয় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু করা গেলে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত হবে। এতে মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় ইনস্টিটিউটগুলোর ওপর রোগীর চাপ কমবে। ভৌগোলিক কারণে কেউ বিশেষায়িত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। প্রতিটি বিভাগীয় সদরে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ও বিশ্বমানের টারশিয়ারি সেবা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা করা গেলে জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য একটি আঞ্চলিক রেফারেল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
এর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৮ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরো মানবিক, আধুনিক ও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার চাপ কমবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য দূর হবে। এজন্য স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি।
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা বাড়াতে হবে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায় না। আবার দেশের একটা বড় অংশ সামান্য অসুস্থতায় চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যান। এ কারণে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো নজরে আসে না। কোভিড কালে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তখন স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো চিহ্নিত করে সমাধানেরও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংকট শেষ হওয়ায় পর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবার প্রবণতা আবার দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা রোধ করা গেলে বিদেশে যে টাকাগুলো চলে যায়, সেগুলো দেশে ব্যয় করা যাবে এবং স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো আরো ভালোভাবে সমাধান করা যাবে।
তাদের মতে, বিদেশে যাওয়ার প্রধান কারণ চিকিৎসার অভাব নয়, বরং রোগ নির্ণয়ের ওপর আস্থার ঘাটতি। এ ছাড়া অপ্রত্যাশিত বিল ও গোপন খরচ, নিম্নমানের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর আশঙ্কা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা।
স্বাস্থ্যবিমা ও স্বাস্থ্য কার্ড চালুর পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ (এএইচআরবি) এর আহ্বায়ক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, স্বাস্থব্যবস্থায় কিছু মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একীভূত কাঠামো প্রতিষ্ঠা, সীমা নির্ধারিত (সিলিং বেসড) বেনিফিট প্যাকেজ চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ সম্প্রসারণ, ওষুধ সরবরাহ-ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সর্বজনীন ফ্যামিলি হেলথ কার্ড প্রবর্তন এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল প্রতিষ্ঠা।
প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবার পেছনে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশ থেকে বিদেশে চলে যায়। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। এ অর্থ দেশে রাখতে হলে হেলথ ইন্স্যুরেন্সের বিকল্প নেই। এ বিষয়ে সরকারের ভাবনা জরুরি।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই দুটি উদ্যোগকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত ১১ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরো শক্তিশালী, সমন্বিত ও কার্যকর করতে জাতীয় ই-হেলথ কার্ড আগামী জুনের মধ্যেই চালু করা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ই-হেলথ কার্ড চালু হলে একজন রোগী গ্রাম থেকে শহর যেখানেই চিকিৎসা নিক না কেন, চিকিৎসক এই কার্ডের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরো কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারবেন।
