নদীতে ফুল ভাসিয়ে বিজু উৎসব শুরু, বিশ্বশান্তি কামনা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
নদীতে ফুল ভাসিয়ে পূজার মাধ্যমে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিজু উৎসব। এ সময় পাহাড়ে মঙ্গল ও শান্তি কামনা করেন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষজন।
রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ফুল দিয়ে পূজা শুরু করেন তরুণ-তরুণীরা। জেলার মাইনী ও চেঙ্গী নদীর বিভিন্ন অংশে ফুল বিজুর আয়োজনে সমবেত হয় সব বয়সী মানুষ।
ফুল বিজুর এ উৎসব মিলন মেলায় পরিণত হয়।
সকালে দীঘিনালায় উপজেলায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে বিজু উদযাপন কমিটি। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পরে মাইনী নদীতে রীতি অনুযায়ী ফুল দিয়ে দেবী গঙ্গাকে পূজা করা হয়।
চৈত্রের ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। সকাল থেকে চাকমা তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বন থেকে সংগ্রহ করা বিজু, মাধবীলতা, অলকানন্দরজ্ঞনসহ নানা রকমের বুনো ফুল নদীর জলে ভাসিয়ে দেন। পরে নদীর পাড়ে গঙ্গা দেবীর প্রার্থনা করেন তারা। এক বছরের অপেক্ষা শেষে ফুল বিজুর উৎসব মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
এতে অংশ নেওয়া প্রগতি চাকমা বলেন, “আমরা ফুল গজানা অনুষ্ঠানে এসেছি। অনেকে ‘ফুল ভাসানো’ বলে কিন্তু এটা হবে ফুল গজানা। মাইনী নদীতে ফুল দিয়ে আমরা মা গঙ্গাকে পূজা করেছি। আমাদের সামনের বছর আরও সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। আমরা নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছি।”
ফুল ভাসাতে এসে প্রবীণ বসুন্ধরা চাকমা বলেন, ‘একসময় সন্তানদের নিয়ে ফুল ভাসাতে আসতাম। এখন বয়স বাড়ায় কষ্ট হলেও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে এসেছি, মনের শান্তির জন্য। এবার প্রাণভরে প্রার্থনা করলাম, সবাই মিলেমিশে যেন ভালো থাকতে পারি, পৃথিবীতে যেন শান্তি থাকে।’

ফুল ভাসাতে আসা তরুণীদের একজন প্রিসিলা চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা মিলে চেঙ্গী নদীতে ফুল ভাসিয়ে আগামী দিনগুলোর জন্য সুখ–শান্তি কামনা করেছি। এখানে শত শত নারী-পুরুষ উৎসবে যোগ দিয়েছেন। আমিও সারা বছর অপেক্ষায় থাকি এদিনটার জন্য।’
উৎসব দেখতে রাবার ড্যাম এলাকায় ভিড় জমান সমতলের লোকজনও। কক্সবাজার থেকে উৎসব দেখতে আসেন উপমা বড়ুয়া ও সালমা আক্তার। তাঁরা জানান, ২০২৪ সালে একবার রাঙামাটিতে ফুল ভাসানো উৎসব দেখতে গিয়েছিলেন দুজন। উৎসব দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। এবার তাই আবারও ফুল ভাসানোর উৎসব দেখতে এসেছেন।
এ উৎসবের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ ও মানুষের কল্যাণ কামনা করা হয়। তিন দিনব্যাপী ‘বিজু উদযাপন কমিটির’ আয়োজনে অংশ নেয় দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানজিল পারভেজ।
তিনি বলেন, “সারাদেশেই নববর্ষের আয়োজন হয়। তবে পাহাড়ের উৎসবের বর্নিলতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে অনেক বেশি বর্ণাঢ্য আয়োজনে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ নতুন বছর বরণ করে নেয়। আজকে ফুল বিজুর অনুষ্ঠান হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অশুভ, জরাজীর্ণতা, গ্লানি ভুলে নতুন বছর আরও সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে এমন প্রত্যাশা থাকবে। এ ধরনের উৎসবের মধ্য পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।”
বাংলা বছরের শেষ দুই দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন চাকমারা বিজু উদ্যাপন করেন। আজ ফুল বিজু, ১৩ এপ্রিল রোববার মূল বিজু, ১৪ এপ্রিল নু’অ বজর বা নতুন বছর, আর পয়লা বৈশাখের পর দিন উদ্যাপিত হয় ‘গোজ্যেপোজ্যে দিন’ হিসেবে। উৎসবের প্রথম দিনে পূজা-অর্চনা ও বাড়িঘর পরিষ্কার করে সাজানো হয়। দ্বিতীয় দিনে অতিথি আপ্যায়ন ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়। তৃতীয় দিনে হাঁস-মুরগি ও পশুপাখিদের খাবার দেওয়া ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়া হয়।
