বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যু, সতর্কতা জারি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নওগাঁ জেলায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। রাজশাহী বিভাগে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে এই রোগের বৈশ্বিক মহামারি হয়ে ওঠার ঝুঁকি ‘নিম্ন’ পর্যায়ে রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি নওগাঁ জেলার ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী এক নারী। গত ২১ জানুয়ারি তাঁর শরীরে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে ২৭ জানুয়ারি তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
আরো পড়ুন : ৩৫ জেলায় ছড়িয়েছে নিপাহ ভাইরাস, হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ
২৮ জানুয়ারি তাঁর গলা থেকে শ্লেষ্মা ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরদিন ২৯ জানুয়ারি পরীক্ষার ফলাফলে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট’ (আইএইচআর এনএফপি) সংক্রমণের বিষয়টি ডব্লিউএইচওকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে।
তদন্তে জানা গেছে, আক্রান্ত ওই নারীর সাম্প্রতিক কোনো বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ‘টেরোপাস’ প্রজাতির ফলাহারি বাদুড়। শীত মৌসুমে বাদুড় খেজুরের রস সংগ্রহের হাঁড়িতে বসলে তাদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে রস দূষিত হতে পারে। সেই কাঁচা রস পান করলে মানুষের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪৮ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। অন্যদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে সংক্রমণ ছড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও দুজনের শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক ঝুঁকি কম এবং কোনো দেশ বা অঞ্চলের ওপর ভ্রমণ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়নি।
নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই ভাইরাসে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ।
সংস্থাটির প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস এক বিবৃতিতে বলেন, কর্তৃপক্ষ নজরদারি ও পরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করেছে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে এবং জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ নির্দেশনা:
নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১. কাঁচা খেজুরের রস পান পরিহার: কোনো অবস্থাতেই কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না। রস অন্তত ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পান করলে ঝুঁকি থাকে না।
২. পাখির খাওয়া ফল বর্জন: বাদুড় বা অন্য পাখির খাওয়া আংশিক ফল বা গাছ থেকে পড়া ফল খাওয়া যাবে না।
৩. রোগীর সংস্পর্শে সতর্কতা: নিপাহ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
৪. উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা: তীব্র জ্বর ও প্রলাপ বকার মতো মানসিক অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই ভাইরাসের মৌসুম চলে। তাই এই সময়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
