হামের টিকার সংকট ৭৩ শতাংশ, বাড়ছে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
টিকা সংকটের কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পাচ্ছে না। ছবি : সংগৃহীত
দেশে কয়েক মাস ধরে হামের টিকার সংকট চলছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) হামের টিকার সরবরাহ ঘাটতি ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন, অর্থছাড়সহ নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
টিকার সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
প্রায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ হাম চলতি বছরে উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত দেশে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। ইপিআই সারা বছর ১২টি রোগের জন্য ১০ ধরনের টিকা দিয়ে থাকে, যার মধ্যে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর টিকা অন্যতম।
ইপিআই সূত্রে জানা যায়, ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিতভাবে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়। তবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এই টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় এ সময়ে মোট চাহিদা ছিল ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪১০ ভায়াল (প্রতি ভায়ালে ৫ ডোজ)। কিন্তু সরবরাহ করা গেছে মাত্র ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫০ ভায়াল। ফলে চাহিদার মাত্র ২৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে, অর্থাৎ ৭২ দশমিক ৫৫ শতাংশ টিকার ঘাটতি থেকে গেছে। এই ঘাটতি মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমে বড় চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পাচ্ছে না। এতে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সময়ে ইপিআইয়ের আওতায় দেওয়া অন্যান্য টিকার ক্ষেত্রেও ঘাটতি দেখা গেছে। পেন্টাভ্যালেন্ট, বাইভ্যালেন্ট ওরাল পোলিও (বিওপিভি), বিসিজি, ইনঅ্যাকটিভেটেড পোলিও (আইপিভি), নিউমোকক্কাল কনজুগেট (পিসিভি) এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার মোট চাহিদা ছিল ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ ভায়াল। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ ভায়ালের কিছু বেশি।
ইপিআই কর্মকর্তারা জানান, অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) থেকে হঠাৎ রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ফলে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগে দেশের স্বাস্থ্য খাতের ৩০টির বেশি কার্যক্রম পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার (ওপি) আওতায় পরিচালিত হতো। সর্বশেষ ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)’ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর নতুন কোনো ওপি অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রকল্প অনুমোদন, পরিচালক নিয়োগ ও অর্থছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় টিকাসহ স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন ঘটে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেনা টিকা দিয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত কার্যক্রম চললেও নতুন অর্থ ছাড় না হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়।
আরো পড়ুন : হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহে একদিনে ২১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, ৪১৯ কোটি টাকার মধ্যে ২০০ কোটি টাকার টিকা ইতোমধ্যে ইউনিসেফের প্রি-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এসেছে। বাকি অর্থ ছাড় হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে টিকা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র ও মূল্যায়নের কারণে টিকা সরবরাহে সময় বেশি লাগছে, যদিও মন্ত্রিপর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ায় জটিলতা কমবে বলে আশা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদানে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু কভারেজ থাকলেও টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা বাড়লে হামের প্রাদুর্ভাবও বাড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ ওপি বন্ধ করা ঠিক হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম সচল রাখা কঠিন এবং এ ধরনের সংকট পুনরায় দেখা দিতে পারে।
চলতি বছর গত সোমবার পর্যন্ত দেশে ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন, আর ২০২৪ সালে ছিল ৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৫ শিশু, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪, রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৮ শিশু মারা গেছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী (৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ) শনাক্ত হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম। বর্তমানে সেখানে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং এক দিনে নতুন করে ১৬ শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছে।
সোমবার দুপুর থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেলে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নাটোর সদর হাসপাতালে মার্চ মাসে ৩৮ শিশু ভর্তি হয়, যার মধ্যে ১৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে তিনজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় জানুয়ারির শেষ থেকে অন্তত ৯ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে তিন মাসে ২৯৩ শিশু ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৫ জন মারা গেছে। বর্তমানে ৭৭ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। সিলেটের হাসপাতালে ৩০ শিশু ভর্তি রয়েছে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ছয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
