কেমন যাচ্ছে আমাদের অডিও শিল্প?
মো: মনজুর আহমেদ
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
কেমন যাচ্ছে আমাদের অডিও শিল্প?
১৬ বছরের রাতুলের কাছে জানতে চাইলাম গান শুনতে কেমন লাগে? উত্তরে জানালো, ‘গান তো শোনাই হয় না!’ কিছুটা অবাক হয়ে আবার প্রশ্ন করলাম, তাহলে অবসরে কি শুধু খেলাধুলাই করো? এবারে তার উত্তর, ‘খেলি, তবে মোবাইলে।’
মনে মনে অনেকটা হতাশ হলেও বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে তাকে আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। অথচ চোখের সামনে ভেসে উঠলো ৯০ এর দশক থেকে শুরু করে এমনকি কয়েকবছর আগের দিনগুলোর কথা। কিশোর থেকে তরুন কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠরাও নিয়মিত গান শুনতো। দিনরাত এক করে দিয়ে সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যেতো। তখন ঘরে ঘরে রেডিও বাজতো। অডিও ক্যাসেট নিয়ে চলতো কাড়াকাড়ি।
ঈদ বা যেকোন উতসবে কিশোর, তরুনরা টাকা জমাতো ক্যাসেট বা সিডি কেনার জন্য, সাথে বোনাস হিসেবে কখনও কখনও প্রিয়শিল্পী বা ব্যান্ডের পোস্টারও পেতো। বন্ধু-বান্ধব বা প্রেমিক প্রেমিকারা একজন আর একজনকে অডিও ক্যাসেট বা সিডি উপহার দিত। গানের কথায় চিঠি এবং ক্ষুদেবার্তা পাঠাতো।
শ্রোতাদের কথা বিবেচনা করে অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝাপিয়ে পড়তো তাদের আয়োজন নিয়ে। সাউন্ডটেক, সংগীতা, স্যারগাম, জি-সিরিজ সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান গড়েই উঠেছিল শুধুমাত্র গান শুনিয়ে ব্যাবসা করার জন্য। কিছু ক্ষেত্রে প্রতারিত হলেও অনেক শিল্পী এবং ব্যান্ড জনপ্রিয় হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এইসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই। দেশে বেশ কয়েকটি এফ এম রেডিও চালু হয়েছিলো অডিও গানের উপর নির্ভর করেই, ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল বেসরকারি এফ এম রেডিও গুলো।
একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন অডিও অ্যালবামের উৎসব। জনপ্রিয় শিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর নতুন অ্যালবাম প্রকাশ পেত এই সময়কে কেন্দ্র করে। ক্যাসেট বা সিডি যুগের অবসানের পরে শুরু হলো ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশনা। সেই পরিস্থিতিতেও উতসবের আয়োজনে কমতি ছিলো না।
দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে এগুলো এখন অতীত।
বর্তমান বাস্তবতায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষের শোনার আগ্রহ নেই বললেই চলে। তারা এখন দেখতে চায়, সেটাও আবার হালের টি-২০ ফরমেটে। ছোট ছোট রিলস দেখেই সময় পার করে দেয়।
এর মাঝেও বেশ কয়েকটি ব্যান্ড এবং কিছু একক শিল্পী তাদের মতো করে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে শ্রোতাদের সাথে সংযোগ রেখে চলছিলেন, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের দিনগুলো থেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিল্পীদেরকে সংগীত সংক্রান্ত বিষয়ের চাইতে রাজনিতী নিয়ে আলাপ করতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। হঠাত করেই যেনো অডিও বাজার নেই হয়ে গেলো! যার ফলাফল আমরা এবার ঈদে দেখতে পেলাম।
এবারের ঈদে তারকা শিল্পীদের মধ্যে ইমরান, কোনাল আর কনার গান শোনা যাচ্ছে, যেগুলো সিনেমার গান। ইমরান আর কনার দ্বৈত গান 'আগুন' শিরোনামের, এটি বেশ সাড়া ফেলেছে। গানটি 'গোলাপী' নামের একটি নাটকের গান। এগুলোকে ঠিক অডিও ইন্ডাস্ট্রির গান হিসেবে না ধরাই ভালো। এছাড়া সিএমভি থেকে মুক্তি পেয়েছে পান্থ কানাই এর "আবার চুমকি" শিরোনামের একটি গান। আর অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে রিলিজ হয়েছে "মওলা" শিরোনামে বালাম এবং "কাছে ডেকে লাভ কি" শিরোনামে প্রত্যয় খানের একটি করে গান। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো গান শোনা যায়নি বা চোখে পড়েনি। একটি বড় উৎসবে মুক্ত হওয়া গানের সংখ্যা দেখেই অনুমান করা যায় অডিও শিল্পের বর্তমান অবস্থা! অথচ বাংলাদেশে এখনও যেসব গান মানুষের মুখে মুখে এর বেশিরভাগ গানই মানুষ প্রথম শুনেছে ঈদ উপলক্ষে।
অডিও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নাটক তৈরিতে মনযোগী হয়েছে। মুঠোফোনে দেখার উপযোগী করে তৈরি করছে কনটেন্ট। বলা যায় ইউটিউব ঘিরেই সবার সব আয়োজন।
আবার এরইমাঝে শুরু হয়েছে এ আই দিয়ে সংগীত তৈরির কাজ। কয়েক সেকেন্ডেই গান তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যেখানে আগে একটি গান তৈরি করতে কয়েকজন মানুষের কঠোর পরিশ্রম আর মেধা একসাথে কাজ করতো, সেখানে কয়েক মিনিটে পুরো গান তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে শ্রোতাদের কাছে গানের সেই আবেদন আর আগের মতো নেই, শ্রোতারাও বদলে গিয়েছে। এর মাঝে অনেক মিউজিশিয়ান তাদের সংগীতের জগৎ ছেড়ে জীবনের তাগিদে অন্য মাধ্যমে বা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন আবার কেউ কেউ পরিবর্তিত পিরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে ধরে রেখেছেন। অনেক নতুন নতুন মুখও দেখা যাচ্ছে যারা নতুন এই ধারায় নতুন কিছু করার চেস্টা করে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের ঈদ অডিও বাজার একটি পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ঐতিহ্যবাহী অ্যালবাম সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে এবং এই পরিবর্তন অনেক পুরনো নস্টালজিয়াকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রি এখন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে অতীতের ঐতিহ্য ও বর্তমানের প্রযুক্তি একসাথে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করছে। তবে এটি নতুন প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার নাকি আশংকার সেটি ভবিষ্যতই বলে দেবে।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী
