×

ভারত

বিশ্লেষণ

অরক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে অমিত শাহের নীলনকশা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম

অরক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে অমিত শাহের নীলনকশা

ছবি : সংগৃহীত

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের নীতি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ইস্যুটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। দলটির ভাষায় ‘ডাবল-ইঞ্জিন সরকার’ গঠনের ফলে—অর্থাৎ বিজেপি এখন কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্থানেই ক্ষমতায় থাকায় দৃষ্টি দ্রুত পূর্ব ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল একটি বিষয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে সরে গেছে।

বছরের পর বছর ধরে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান এবং সীমান্ত বেড়া নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাগাড়ম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু এবার বিজেপি নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় সরকার স্লোগান ও লোকদেখানো উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

খবরে প্রকাশ, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন সীমান্ত-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম কেবল প্রচারমূলক না হয়ে বাস্তবসম্মত, আইনি দিক থেকে টেকসই এবং কার্যকর হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার সতর্ক করে বলেছেন, কোনো অর্ধসমাপ্ত বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত যেন গ্রহণ করা না হয়, যা কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছেন। এখন এলোমেলো বা তড়িঘড়ি করে পুশব্যাক অভিযান চালানোর পরিবর্তে, প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের সতর্কতার সঙ্গে শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের এমন কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছেন যা অকারণে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। অতীতে, যখনই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যথাযথ যাচাই-বাছাই বা সমন্বয় ছাড়াই কথিত অনুপ্রবেশকারীদের কেবল 'ফিরিয়ে দেওয়া' হয়েছে, ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। যার ফলে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এবারের কৌশলটি ভিন্ন।

কেন্দ্রীয় সরকার এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করতে চায়, যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের যথাযথভাবে শনাক্ত ও নথিভুক্ত করার পর আনুষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আন্তর্জাতিক বিতর্ক এড়িয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরো সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে শক্তিশালী করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

আরো পড়ুন : তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জীর ওপর হামলা

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পদ্ধতিটি এমন একটি উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে একটি মানবিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও।

বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতাও দেখায় যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন অব্যাহত ছিল। দীর্ঘ ও অরক্ষিত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পুরোপুরি নিরাপদ করা কতটা কঠিন, তা বোঝাতে এখন অভ্যন্তরীণ আলোচনায় প্রায়ই এই উদাহরণটি উল্লেখ করা হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ অংশে, পরিস্থিতি আরো জটিল। সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশ ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, কৃষিজমি, নদীতীরবর্তী এলাকা, চরাঞ্চল, বনভূমি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। অনেক স্থানে তথাকথিত শূন্য রেখা বা প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত এমন জনবসতির মাঝখান দিয়ে গেছে যেখানে পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে।

ভারত সরকার বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি করেছে। বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যেসব জমি অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন, সেসব জমির মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, পুরো সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়।

ভারত সরকার মনে করছে, শুধু বলপ্রয়োগ বা প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে সফল করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগণকে আস্থায় নেওয়া এবং তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষক, গ্রামবাসী ও জমির মালিকদের সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কারণ সীমান্ত বেড়া নির্মাণ অনেক ক্ষেত্রে তাদের কৃষিকাজ, চলাচল এবং জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

গত মে মাস পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯৬ কিলোমিটার এলাকায় ইতোমধ্যে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়াহীন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১২ দশমিক ৭৮০ কিলোমিটার এলাকা নদীবেষ্টিত ও জলাভূমিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে বেড়া নির্মাণ বাস্তবসম্মত নয় বলে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৪৫৬ দশমিক ২২৪ কিলোমিটার এলাকা প্রযুক্তিগতভাবে বেড়া নির্মাণের উপযোগী হলেও সেখানে কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্ত বেড়া নির্মাণকে সরকারের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সীমান্ত বেড়া ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিএসএফকে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া। এরই অংশ হিসেবে শিলিগুড়ির কাছে ফাঁসিদেওয়ায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশ ইতোমধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে রাজ্য সরকার। সেখানে গত ২১ ও ২২ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত বেড়া নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, রাজ্যের মুখ্যসচিব ও ভূমি দপ্তরকে ৪৫ দিনের মধ্যে অবশিষ্ট সব জমি হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি নতুন সীমান্ত চৌকি (বিওপি) এবং বিএসএফের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্যও প্রয়োজনীয় জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজ্য সরকার। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন, কারণ অতীতে সীমান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক বিলম্বই ছিল সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর অন্যতম।

বিএসএফের কাছে অধিগ্রহণকৃত জমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতার কারণে কলকাতা হাইকোর্ট অতীতে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছিল। ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি আদালত রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়, অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান সম্পন্ন হওয়া ১২৭ বর্গকিলোমিটার জমি ৩১ মার্চের মধ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তবে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটার জমি হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে জানা যায়। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হয়।

২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী—৭৭ দশমিক ৯৩৫ কিলোমিটার জমি সীমান্ত বেড়া নির্মাণের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছিল। ১৪৮ দশমিক ৯৭১ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণের কাজই শুরু হয়নি। ২২৯ দশমিক ৩১৮ কিলোমিটার এলাকা এখনো প্রক্রিয়াধীন ছিল এবং ১৮১ দশমিক ৬৩৫ কিলোমিটারের জন্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হলেও জমির দখল হস্তান্তর করা হয়নি।

বর্তমান প্রশাসনের অধীনে সরকার দাবি করছে, সীমান্ত প্রকল্পের অগ্রগতি এখন গতি পেয়েছে। ফাঁসিদেওয়ার মতো বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে পাওয়া মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এতে স্বস্তি প্রকাশ করছেন। জানা গেছে, একাধিক গ্রামবাসীর মতে, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, গবাদিপশু চোরাচালান চক্র এবং অনুপ্রবেশের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন। কিছু বাসিন্দা এমনও অভিযোগ করেছেন যে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর কারণে তারা নিরাপদে গবাদিপশু পালন করতেও সমস্যার মুখে পড়েছেন।

বিজেপি সরকার বর্তমানে এমন একটি কাঠামো গ্রহণ করেছে, যাকে কর্মকর্তারা “শনাক্ত করো, অপসারণ করো এবং বহিষ্কার করো” নীতি হিসেবে অভিহিত করছেন। এই ব্যবস্থার অধীনে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো সংবেদনশীল জেলাগুলোর ওপর, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।

তবে এই কঠোর নীতি ও উদ্যোগ সত্ত্বেও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। গোয়েন্দা ব্যুরোর (আইবি) সাবেক কর্মকর্তারা এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। আইনি বিরোধ, পুনর্বাসন সংক্রান্ত জটিলতা, জমির ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত সমস্যা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি পুরো প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত ধীর করে তুলেছে।

সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তির আওতায় থাকা ‘১৫০-ইয়ার্ড বিধান।’ এই সমঝোতা অনুযায়ী, দুই দেশের সম্মতি ছাড়া সাধারণত শূন্যরেখা (জিরো লাইন) থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। ভারত সীমান্ত বেড়াকে সামরিক প্রতিরক্ষা স্থাপনা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছাকাছি বেড়া নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রায়ই আপত্তি জানিয়ে এসেছে। ফলে সাধারণত ভারতের ভেতরে, সীমান্তরেখা থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে বেড়া নির্মাণ করা হয়।

এর ফলে এমন একটি এলাকা সৃষ্টি হয়, যাকে অনেক গ্রামবাসী ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিভিন্ন সীমান্ত জেলায় প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও বেড়ার মাঝামাঝি অংশে গ্রাম, স্কুল, মন্দির, কৃষিজমি এবং বাজার রয়েছে। এর ফলে বহু ভারতীয় নাগরিক কার্যত বেড়ার বাইরে বসবাস করেন, যদিও তারা ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই রয়েছেন।

এতে ব্যাপক নিরাপত্তা ও মানবিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। বেড়ার বাইরে বসবাসকারী মানুষ প্রায়ই চোরাচালান চক্র, অনুপ্রবেশ, চাঁদাবাজি এবং আন্তসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিতে থাকেন। কৃষকেরা নিজেদের জমিতে যাতায়াতেও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়েন, কারণ বিএসএফের নিয়ম অনুযায়ী চলাচলের সময়সীমা প্রায়ই সীমিত থাকে।

ফলে অনেক গ্রামবাসী দাবি জানিয়েছেন, সীমান্ত বেড়া হয় সরাসরি জিরো লাইনে নির্মাণ করতে হবে, অথবা অন্তত তার আরো কাছাকাছি স্থাপন করতে হবে। তবে বাংলাদেশ বহু সীমান্ত খাতে এখনো আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এ ধরনের নির্মাণকাজ পূর্ববর্তী সীমান্ত-সমঝোতার লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রায় ৯০টি বিতর্কিত স্থানে নতুন করে যৌথ পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব স্থানে ভারত সীমান্তের আরও কাছাকাছি বেড়া নির্মাণ করতে চায়। একই সময়ে দুর্গম ভূপ্রকৃতিও কাজকে জটিল করে তুলছে। প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা নদীবেষ্টিত বা জলাভূমিপূর্ণ। ইছামতী ও পদ্মার মতো নদীগুলোতে চরভূমির অবস্থান ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং মাটির স্থিতিশীলতা কম থাকে। ফলে সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ক্রমবর্ধমানভাবে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর, লেজার সিস্টেম, ড্রোন এবং রাডারভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌত অবকাঠামোভিত্তিক বেড়া এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই হাইব্রিড মডেল ভবিষ্যতে পূর্ব ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, প্রযুক্তি একাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত নিরাপত্তা রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সে কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার এখন কেবল আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে আরো পরিকল্পিত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশল গ্রহণ করছে বলে মনে হচ্ছে।

তবুও রাজনৈতিকভাবে বিজেপি বর্তমান সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। দলটির মতে, যদি ‘ডাবল-ইঞ্জিন সরকার’ সীমান্ত নিরাপত্তায় দৃশ্যমান উন্নতি আনতে পারে, অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বেড়া নির্মাণ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়, তবে তা আগামী বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে।

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ নাগাদ, দীর্ঘ বিলম্বের পর অবশেষে সীমান্ত বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকা বেড়াবিহীন রয়ে গেছে এবং একাধিক আইনি ও ভৌগোলিক জটিলতা অমীমাংসিত রয়েছে। ফলে সরকারি অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছে যে, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে রাজনৈতিক সময়সীমার তুলনায় অনেক বেশি সময় প্রয়োজন হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অরক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে অমিত শাহের নীলনকশা

বিশ্লেষণ অরক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে অমিত শাহের নীলনকশা

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ

ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য, টিকায় নির্মূল হবে টিউমার

ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য, টিকায় নির্মূল হবে টিউমার

সৌদি আরবে হজে গিয়ে ৩৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

সৌদি আরবে হজে গিয়ে ৩৭ বাংলাদেশির মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App