সুয়েজে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন, হরমুজে কী অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সাম্রাজ্যের পতন কখনো হঠাৎ ঘটে না, এর পেছনে থাকে কিছু নির্দিষ্ট ও পুনরাবৃত্ত কারণ। ইতিহাস বলে, যখন কোনো সাম্রাজ্য তার সামরিক বিস্তারকে রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না, যখন অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যাদের দমন করতে চায় তারা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে ঠিক তখনই পতনের সূচনা হয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ছিল এমনই এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় ধাক্কা লাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দুর্বল ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক অভিযান চালালেও প্রাথমিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জয় আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক চাপ, ব্রিটেনকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে যায়।
সত্তর বছর পর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা অনেকের কাছে একই ধরনের একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। উভয় ক্ষেত্রেই একটি প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য এমন এক আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে, যা নতি স্বীকারে অনিচ্ছুক। অতীতে যেমন সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করা হয়েছিল, তেমনি ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে শুধু সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাই করেননি, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিত্তিকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। এই খাল ছিল ব্রিটেনের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগের কেন্দ্র। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের ত্রিপক্ষীয় সামরিক অভিযান প্রাথমিকভাবে সফল হলেও তা রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ারের কঠোর অবস্থান এবং অর্থনৈতিক চাপ ব্রিটেনকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারে না।
এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান ঘটায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। লন্ডন উপলব্ধি করে যে, আমেরিকার সম্মতি ছাড়া তারা আর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক দিক থেকে সেই সময়ের ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনীয়। বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও দেশটি বিপুল ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং বহুমুখী বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির চাপে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং ইন্দো-প্যাসিফিকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখলেও, একই সঙ্গে তা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সীমিত করে তুলছে।
অন্যদিকে ইরান একটি ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে। তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা কৌশল তাকে দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলায় সক্ষম করেছে। তাদের লক্ষ্য সীমিত, রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা এবং প্রতিরোধ বজায় রাখা। এই অসম লক্ষ্যের সংঘাতে সাধারণত সীমিত লক্ষ্যধারী পক্ষ দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে আঞ্চলিক কাঠামো পরিবর্তনের বৃহৎ লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, সেখানে ইরান কেবল টিকে থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে।
আরো পড়ুন : ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় তেল বাজারে বড় অস্থিরতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এক জটিল দ্বিধার মুখে। উত্তেজনা বাড়ালে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে। অন্যদিকে লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই উত্তেজনা কমালে তা তার প্রভাবশালী অবস্থানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করবে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যেখানে কোনো একক শক্তি সম্পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন শক্তি নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, সাম্রাজ্যের পতন কখনো একক কোনো ঘটনার ফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল। সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা চিহ্নিত করেছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা হয়তো একটি নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—সাম্রাজ্য একদিনে ভাঙে না, তারা ভাঙে তখনই, যখন তাদের সামরিক শক্তি আর রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে না। সুয়েজ থেকে হরমুজ- এই ধারাবাহিকতা হয়তো সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই আরেকটি অধ্যায়, যা এক যুগের অবসান এবং নতুন বাস্তবতার সূচনার ইঙ্গিত।
