প্রসিকিউরের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে অনুসন্ধান কমিটি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৩ এএম
ছবি: ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত সাইমুমের ঘুষ চাওয়ার অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়া সংক্রান্ত খবরের স্ক্রিনশট
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর স্ত্রীর কাছে এক কোটি টাকার ঘুষ চাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’র প্রধান আমিনুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, ‘ভয়েসটা আমরা ডিটেক্ট করেছি যে এটা জেনুইন। তাদের মধ্যেই কথোপকথনটা হয়েছে। এটা এআই না, জেনুইন। যে কথোপকথনটি হয়েছে, সেখানে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক সদস্যের কণ্ঠ এবং সাইমুম রেজা তালুকদারের কণ্ঠ শনাক্ত করেছেন তাঁরা।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একজন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার— যিনি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার এক আসামি ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তার স্ত্রীর কাছে এক কোটি টাকা ঘুষ চান। তার সেই ঘুষ চাওয়ার অডিওটি মিডিয়ার মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর আমরা একটা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করি। ইতোমধ্যে সেই অডিও রেকর্ডের সত্যতা পেয়েছি। এখানে তাদের দুইজনেরই কথা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কথোপকথনের সত্যতা পেলেও এর বাইরে তাদের কোনও লেনদেন হয়েছে কিনা, সে বিষয়টি এখনও খতিয়ে দেখছি। এর আগে এই বিষয়টা যখন আমাদের সামনে আসে, তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করি এবং এরপরই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করলেও এ বিষয়টি আমরা তদন্ত করে যাচ্ছি। খুব দ্রুতই আমরা তদন্ত রিপোর্টটি প্রকাশ করবো এবং আসল সত্যটা তুলে ধরবো। পরে প্রতিবেদনটি আইন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করবো।’
এর আগে গত ৯ মার্চ রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে করিম চৌধুরীর স্ত্রী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের মধ্যে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়, যাতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত একটি মামলায় গ্রেপ্তার চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে সাইমুমকে এক কোটি টাকা চাইতে শোনা যায়।
জামিনের বিনিময়ে ঘুষ চাওয়া ছাড়াও সেই কথোপকথনে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ, মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হিসেবে বিএনপির এক সংসদ সদস্য এবং এক প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শও দেন সাইমুম। এমনকি, ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামকে ‘রিজনেবল’ হিসেবে উল্লেখ করে মামলা থেকে মুক্তি পেতে তার সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলেও সাইমুমকে বলতে শোনা যায় ওই অডিও কথোপকথনে।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, সাবেক এই সংসদ সদস্যকে আটকের প্রায় দুই মাস পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার প্রথমবারের মতো নিজে থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অর্থের বিনিময়ে জামিন নিশ্চিত করতে পারবেন বলে জানান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে পরিবারটি সাইমুম রেজার সঙ্গে তাঁদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা শুরু করে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সাইমুম রেজা মোট ২৬ বার এই বিষয়ে যোগাযোগ করেছেন এবং অন্তত ১৪ বার ঘুষ চেয়েছেন।
সাইমুমের ওই অডিও কথোপকথন ফাঁসের পরের দিন (১০ মার্চ) ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধানে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটির বাকি চার সদস্য প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, নতুন দুই প্রসিকিউটর মর্জিনা রায়হান মদিনা ও মোহাম্মদ জহিরুল আমিন এবং সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা মো. সিফাত উল্লাহকে নিয়ে সেদিন থেকেই অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়। তদন্ত শুরুর ২৩ কর্মদিবস পর ওই অডিও রেকর্ডের সত্যতা নিশ্চিত করলো ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’।
৯ মার্চ তারিখে ওই অডিও রেকর্ডটি ফাঁসের পর ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের ফেসবুকে ‘এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা’ দাবি করে পোস্ট দেন সাইমুম রেজা তালুকদার। আর সেদিনই শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে পদত্যাগও করেন তিনি। প্রসঙ্গত, সাইমুম পেশায় একজন শিক্ষক এবং প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন।
উল্লেখ্য, সাইমুমের এই ঘুষ চাওয়ার অডিও প্রকাশ্যে আসার দুই সপ্তাহ আগে (২৪ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর থেকে তাজুল ইসলামকে অপসারণ করা হয় এবং ওই অপসারণের কয়েক ঘণ্টা পরই তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছিলেন তাজুলের নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিমেরই সদস্য অ্যাডভোকেট বিএম সুলতান মাহমুদ।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত একটি মানবতাবিরোধী মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ দেখিয়ে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। সেই মামলাটি থেকেই জামিন ও অব্যাহতির বিনিময়ে ঘুষ চেয়েছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার।
