মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মধ্যেই বৈশ্বিক তেল সংকট ধীরে ধীরে আরো বড় এক সংকটে রূপ নিচ্ছে। শুধু জ্বালানি নয়, দৈনন্দিন প্রায় সব পণ্যের সরবরাহই হুমকির মুখে পড়েছে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী যুদ্ধের কারণে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে।
এই বিঘ্নের প্রভাব শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্লাস্টিক, রাবার ও পলিয়েস্টারের মতো কাঁচামালের ঘাটতি তৈরি করে তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ভোক্তা বাজারে। জুতা, পোশাক, প্লাস্টিক ব্যাগসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনও এখন ঝুঁকিতে।
বিশ্বের উৎপাদনের বড় অংশ যেহেতু এশিয়ায়, তাই এই অঞ্চলে সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ায় মানুষ আতঙ্কে অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যাগ কিনছে, ফলে সরকার একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে। তাইওয়ানে প্লাস্টিক সংকটে পড়া কারখানাগুলোর জন্য হটলাইন চালু করা হয়েছে। এমনকি কৃষকরাও প্যাকেজিং সংকটের কারণে চালের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছেন।
জাপানে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক, হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত প্লাস্টিক টিউবের অভাবে কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার গ্লাভস উৎপাদকরা বলছেন, রাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোলিয়াম উপাদানের অভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ হুমকিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল ও জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত খুব দ্রুত পেট্রোকেমিক্যাল এবং সেখান থেকে ভোক্তা পণ্যে প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট, এমনকি খেলনা ও প্রসাধনী—সবকিছুর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এই সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। অনেক দেশ জরুরি মজুদ থেকে তেল ছাড়লেও সমস্যার মূল জায়গা হলো ন্যাফথা, যা প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন সিন্থেটিক পণ্য তৈরির প্রধান কাঁচামাল। এর কোনো সহজ বিকল্প নেই এবং মজুদও সীমিত।
এশিয়ার অনেক পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া রাশিয়া থেকে ন্যাফথা আমদানি শুরু করেছে এবং নিজস্ব সরবরাহ রক্ষায় রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও মেডিকেল প্যাকেজিং শিল্পে বড় চাপ পড়ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এশিয়ায় প্লাস্টিকের দাম প্রায় ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। থাইল্যান্ডে প্যাকেজিং ব্যাগের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে, ভারতে বোতলের ঢাকনার দাম চারগুণ হয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার নুডলস কোম্পানিগুলোর কাছে মাত্র এক মাসের প্যাকেজিং মজুদ আছে।
আরো পড়ুন :মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটকে খুঁজে পাওয়ার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকনির্ভর পণ্য যেমন প্রসাধনী দ্রুত সংকটে পড়তে পারে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে সার, হিলিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের বড় সরবরাহকারী হওয়ায় খাদ্য ও প্রযুক্তি খাতেও প্রভাব পড়ছে।
মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক এবং আর্থিক পরিষেবা সংস্থা মর্গান স্ট্যানলির তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে ন্যাফথা, প্লাস্টিক রেজিন, সালফার, হিলিয়াম এবং সার উৎপাদনের বড় অংশ সরবরাহ করে, যা বন্ধ হলে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট ধাপে ধাপে পশ্চিমা দেশগুলোর দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে, অনেকটা করোনা মহামারির সময়ের মতো।
বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিলেও এপ্রিল থেকে সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হতে পারে। অনেক কোম্পানি উৎপাদন কমাচ্ছে, কেউ কেউ বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, তবে সেটিও ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রাণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এশিয়ার প্লাস্টিক শিল্প স্বাভাবিক হতে অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে, এই তেল সংকট এখন আর শুধু জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ধীরে ধীরে একটি “সবকিছুর সংকটে” রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
