রূপপুরে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু, নতুন যুগে বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের’ (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জ্বালানি (ফুয়েল) লোডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এই ফুয়েল লোড প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এটিই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার শেষ ধাপ।
এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন প্রক্রিয়ার সূচনা হলো। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে প্রকল্প সাইটে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসির ধারণ করা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন।
আরো পড়ুন : রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ হবে
রাশিয়ার প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দুই ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের মূল স্থাপনা হলো রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্র। এই চুল্লিতেই ইউরেনিয়াম-২৩৫ জ্বালানি লোড করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম-২৩৫ ছোট ছোট পেলেট আকারে প্রস্তুত করে ফুয়েল রডে ভরা হয়। একাধিক ফুয়েল রড মিলিয়ে তৈরি হয় ফুয়েল এসেম্বলি, যার দৈর্ঘ্য সাধারণত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার। রিয়্যাক্টর-১ এ মোট ১৬৩টি এসেম্বলি সংযোজন করা হবে। এই জ্বালানি রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে এবং চুক্তি অনুযায়ী পুরো প্রকল্পের মেয়াদেই তারা জ্বালানি সরবরাহ করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুল্লিতে জ্বালানি লোড করতে সাধারণত ২১ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। এরপর নিউট্রন বিক্রিয়ার মাধ্যমে ফিশন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং নিয়ন্ত্রিত চেইন রিয়াকশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ থেকে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে।
ফুয়েল লোডিং শেষে ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে আগামী জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যাওয়া হবে, যা ২০২৬ সালের শেষ বা ২০২৭ সালের শুরুতে সম্ভব হতে পারে।
কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (এনপিসিবিএল)। শুরুতে রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা হলেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাই দায়িত্ব নেবেন।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২.৬ বিলিয়ন ডলার। এতে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট করে। ফলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০০ বছর পর্যন্ত করা যেতে পারে।
প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্রটি। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ এখনও চলমান এবং আগামী বছরের শেষ নাগাদ তা সম্পন্ন হতে পারে। পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেবে।
