হাম নিয়ে আগেই ইউনূস সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে হামের পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সোমবার (৪ মে) একদিনে রেকর্ড ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে হামে। এসব শিশুমৃত্যুর জন্য সংশ্লিষ্টরা স্পষ্টভাবেই ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করছেন।
এদিকে নতুন তথ্য সামনে এসেছে—হাম পরিস্থিতি নিয়ে আগেই অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ। একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই ইউনিসেফ টিকাদান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যাতে প্রতিটি শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়।
বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে ইপিআই চালুর পর থেকে ইউনিসেফ সরকারকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী সংস্থাটি সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করে, যাতে প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছানো যায়। এর জন্য তারা বৈশ্বিক ক্রয়ক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একত্র করে।
এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ পোলিও নির্মূল, নতুন টিকা চালু এবং টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখার মতো বড় সাফল্য অর্জন করেছে। ইউনিসেফের সহায়তায় দেশে পূর্ণ টিকাদান কাভারেজ ১৯৮০ সালের ২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি জানান, ইউনিসেফ পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতকের টিটেনাস নির্মূল, হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণ এবং এইচপিভি ও টিসিভি টিকার মতো নতুন টিকা চালু করতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি স্কুলভিত্তিক পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমের সঙ্গে টিকাদান যুক্ত করে একটি সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। শক্তিশালী সরকারি নেতৃত্ব, তথ্যভিত্তিক কৌশল, কমিউনিটির আস্থা এবং ইউনিসেফসহ অংশীদারদের সহযোগিতার ফলে গণটিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।
স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া বলেন, বিশ্বব্যাপী টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইউনিসেফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং শতাধিক দেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হয়ে আসছে, যার ফলে সময়মতো ও সাশ্রয়ীভাবে টিকা সরবরাহ সম্ভব হয়েছে।
আরো পড়ুন : হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ছাড়ালো ৩০০
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ইউনিসেফ উদ্বেগ জানায় যে এতে টিকা সংগ্রহে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়, যার ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে।
সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ ২০২৫ সালে আগাম অর্থায়নের মাধ্যমে টিকা সরবরাহ অব্যাহত রাখে, যার ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বজায় ছিল। তবে কিছু টিকা আগেই শেষ হয়ে যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়।
এ অবস্থায় অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ও ক্রয়প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন না হওয়া এবং সরকারের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এই সংকটকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনিসেফ ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে মার্চে উন্মুক্ত দরপত্র বাতিলের নির্দেশ দেন। এরপর এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ শুরু হয়।
ইউনিসেফ একটি বিশেষ প্রিফাইন্যান্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকা সরবরাহ সচল রাখে, যাতে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলেও কার্যক্রম বন্ধ না হয়। ২০২৫ সালে সংস্থাটি প্রায় ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আগাম অর্থায়ন করে এবং ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে টিকা সরবরাহ বজায় রাখতে।
সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ইউনিসেফ বৈশ্বিক জরুরি তহবিল ও কারিগরি সহায়তা সক্রিয় করে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে অতিরিক্ত সম্পদ নিশ্চিত করে।
সংস্থাটি ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটসহ ইউরোপ, জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করে, যাতে মান, নির্ভরযোগ্যতা এবং কম দামে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া বলেন, রোগীর তথ্য প্রকাশে বিলম্ব বাংলাদেশের রোগ নজরদারি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা। বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে টিকার ঘাটতি, নজরদারির বিলম্ব এবং জনগণের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় ধাপ পরিচালনা না হওয়া।
২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফ হামের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। যদিও সম্ভাব্য ক্যাম্পেইনের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই টিকা প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত এমআর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা এপ্রিল মাসে শুরু হয়।
তিনি জানান, ইউনিসেফ একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিবারই আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাব্য টিকা ঘাটতি, রোগের বিস্তার এবং মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
