গোলাম পরওয়ার
ফ্যাসিজম চাপালে আবারও জুলাইয়ের পথে যাবে দেশ
বাবুল আক্তার, খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি সরকার মেজরিটির দোহাই দিয়ে ফ্যাসিজম চাপিয়ে দিলে আবারও একটি জুলাইয়ের রক্তাক্ত পথে ধাবিত হবে দেশ।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটকে আলাদা করে ফেলেছে সরকার। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে বললেও গণভোটকে এড়িয়ে গিয়ে হাসিনার পথে হাঁটছে সরকার। জুলাই সনদ অনুযায়ী বিদেশি চুক্তি পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষকে জানানোর কথা থাকলেও সরকার দিল্লির কাছে দাসখত দিয়ে তা মানছে না।
শনিবার (২ মে) সকালে খুলনা প্রেসক্লাব ব্যাংকুয়েট হলে অনুষ্ঠিত ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতে ইসলামের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান। সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়- এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার দাবি, সরকার ও মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটে জনগণের দেওয়া সরাসরি রায়ের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখছে।
তিনি বলেন, একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানে, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন তোলেন, গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কেন কোনো আপত্তি তোলেনি। ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ, ফেব্রুয়ারিতে ভোট- এই পুরো সময়জুড়ে কেউ বলেনি এসব অসাংবিধানিক। অথচ ক্ষমতায় বসেই সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা।
সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, যা বাস্তবে সংস্কারের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়।
তিনি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেন, যেসব বিষয়ে বিএনপি আপত্তি তুলেছে- প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি মানতে অস্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না মানা, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।
তিনি বলেন, এই ১০টি জায়গা বাদ দিলে পুরো সংস্কারই অর্থহীন হয়ে যায়। সরকার আসলে এখানেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে যে রায় এসেছে, সেটি সংসদের ডেলিগেটেড ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি- তারা ডেলিগেটেড পাওয়ার এক্সারসাইজ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।
সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। পার্লামেন্ট কখনোই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। সরকারের বর্তমান অবস্থানকে তিনি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। তিনি সতর্ক করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম, জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব শ ম আবু তালিব, খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, এনসিপির খুলনা মহানগরীর প্রধান সমন্বয়ক আহম্মদ হামীম রাহাত, খুলনা মহানগরী খেলাফত মজলিসের সভাপতি এফ এস হারুন অর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসান, খুলনা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক, মাওলানা শেখ মো. অলিউল্লাহ, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, জি এম আব্দুল গফুর, অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম লিটন।
এছাড়া গণভোটের দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন টাইফুন শিল্পীগোষ্ঠী খুলনার শিল্পীবৃন্দ।
