×

স্মরণ

বুরুঙ্গা গণহত্যা : ২৬ মে ১৯৭১

পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ

Icon

গীতাঞ্জলি দাস আলো

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ

ছবি: বুরুঙ্গা গণহত্যা স্মরণে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ

সিলেটের বুরুঙ্গা গ্রামের সেই ভয়াল স্মৃতি আজও যেন বাতাসে ভাসে। ১৯৭১ সালের ২৬ মে সিলেটের প্রত্যন্ত এই জনপদে বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছিলো, যার ক্ষত আজও শুকায়নি। এই হত্যাকাণ্ড ছিলো পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে একত্রিত করে পরবর্তীতে শুধুমাত্র হিন্দুদেরকেই হত্যা করা হয়েছিলো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ব্যাপী চলা বর্বরতার ইতিহাসে বুরুঙ্গা গণহত্যা একটি স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে। এটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ সমরের ঘটনা নয়, বরং নিরীহ জনগণকে কূটকৌশলে ফাঁদে ফেলে হত্যার এক পূর্বপরিকল্পিত নৃশংস মহড়া। ১৯৭১ সালের ২৬ মে সিলেট জেলার তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলার (বর্তমান ওসমানীনগর) বুরুঙ্গা গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ছিলো এই বীভৎস হত্যাযজ্ঞের নীরব সাক্ষী।

সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলায় বুড়িবরাক নদীর তীরে অবস্থিত বুরুঙ্গা ছিলো একটি সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যুদ্ধ শুরুর পর চারপাশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকলে, প্রত্যন্ত এই গ্রামে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় চলে আসেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে গ্রাম তাদের আশ্রয় দিয়েছিলো, সেখানেই তাদের মৃত্যু অপেক্ষা করছিলো।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ২৫ মে বিকেলে, যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমনের খবরে এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর কাছে গেলে তিনি এবং ইউনিয়ন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছয়েফ উদ্দিন মাস্টার তাদের আশ্বস্ত করে একটি কূট-পরিকল্পনার জাল বোনেন।

তাদের নির্দেশে গ্রামে গ্রামে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয়, পরদিন ২৬ মে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি শান্তি কমিটি গঠন করা হবে এবং উপস্থিত সবাইকে ‘শান্তি কার্ড’ (ড্যাণ্ডি কার্ড) বিতরণ করা হবে। জনগণকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, এই বিশেষ পরিচয়পত্র থাকলে পাকিস্তানি বাহিনী আর কাউকে কোনো প্রকার নিপীড়ন বা হয়রানি করবে না।

পরদিন প্রতিশ্রুত আশ্বাসে ভর করে ভোর ছয়টা থেকেই মানুষ স্কুল মাঠে আসতে শুরু করে। সকাল আটটার মধ্যে বুরুঙ্গা ও আশপাশের গ্রামের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের এক হাজারেরও বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হয়।

সকাল নয়টার দিকে ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন খানের নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা এবং স্থানীয় রাজাকার নেতা আব্দুল আহাদ চৌধুরী ও ডা. আব্দুল খালেক জিপে করে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। তারা একটি তালিকা মিলিয়ে উপস্থিত লোকজনকে হিন্দু ও মুসলিম হিসেবে আলাদা করে ফেলে।

এরপর নিষ্ঠুর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়। হিন্দুদের বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে এবং মুসলিমদের দক্ষিণ দিকের একটি ক্লাসরুমে আটকে রাখা হয়। মুসলিমদের প্রথমে কালেমা পাঠ ও পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করা হয়, তারপর অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু মুসলিম যুবককে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয় নাইলনের রশি এনে হিন্দুদের হাত-পা বাঁধতে।

ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর ১২টা ছুঁয়েছে, তখন বন্দী হিন্দুদের বিদ্যালয় ভবনের বাইরে মাঠে এনে হাত বেঁধে লাইনে দাঁড় করানো হয়। সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন খানের নির্দেশে মাঠের চারপাশ ঘিরে রাখা পাকিস্তানি সেনারা লাইট মেশিনগান (এলএমজি) দিয়ে একযোগে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। এই ব্রাশ ফায়ারে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অগণিত নিরীহ মানুষ, যাদের মধ্যে ছিলেন শিশু, নারী ও বৃদ্ধা।

হত্যাযজ্ঞ শেষ করে পাকিস্তানি সেনারা নৃশংসতার মাত্রা আরও বাড়ায়। তারা নিহতদের গুলিবিদ্ধ লাশে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো শুধু হত্যা নয়, বরং প্রমাণ ধ্বংস করে পুরো ঘটনাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশ, প্রায় ৭২ জনকে, পরে বুরুঙ্গা গণকবরে সমাহিত করা হয়।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী বুরুঙ্গা গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৭১ থেকে ৯৪ জন। আবার বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর বিবরণ অনুযায়ী বুরুঙ্গা গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ছিলো ৯৪ জন। তবে অধিকাংশ গবেষক ও ইতিহাসবিদ স্বীকার করেন যে, এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে অন্তত ৭৮ জন বাঙালি হিন্দু প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে সিলেট বারের প্রভাবশালী আইনজীবী রামরঞ্জন ভট্টাচার্যও ছিলেন।

এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী ছিলেন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন খান, তিনি ওই হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আরো দায়ী ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান ইনজাদ আলী এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছয়েফ উদ্দিন মাস্টার, যারা গ্রামবাসীকে ফাঁদে ফেলে সমবেত করিয়েছিলেন। রাজাকার নেতা আব্দুল আহাদ চৌধুরী এবং ডা. আব্দুল খালেক, যারা তালিকা ধরে হিন্দুদের চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিলো।

স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এই নৃসংস হত্যাযজ্ঞের বিচার না হলেও, পরবর্তী সময়ে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে ৯ জন অভিযুক্ত স্থানীয় রাজাকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সিলেটের বিভিন্ন গণহত্যার পাশাপাশি বুরুঙ্গা গণহত্যার বিষয়েও সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র সংগ্রহ করে। বুরুঙ্গা ও আদিত্যপুর গণহত্যার মূল স্থানীয় খলনায়ক সাদ মাস্টারকে বিচারের আওতায় আনার দীর্ঘ দাবি ছিলো। তবে ট্রাইব্যুনালে চূড়ান্ত সাজার রায় হওয়ার আগেই বার্ধক্যজনিত কারণে বা স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় আইনিভাবে তার শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

গণহত্যার শিকারদের স্মরণে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘বুরুঙ্গা বধ্যভূমি’ নামে পরিচিত। ২০১৬ সালে তিনজন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এই স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, যা আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রতি বছর ২৬ মে স্থানীয় জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বুরুঙ্গা গণহত্যা দিবস’ পালন করে আসছে।

বুরুঙ্গা গণহত্যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি ছিলো নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে হত্যার একটি নিখুঁত পরিকল্পনা। এই হত্যাকাণ্ড ছিলো পাকিস্তানিদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে একত্রিত করে পরবর্তীতে শুধুমাত্র হিন্দুদের হত্যা করা হয়, যা জাতিগত নির্মূল অভিযানেরই অংশ ছিলো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধাবস্থায় নিরাপত্তার নামে প্রচারিত প্রতারণা ও মৌলবাদী শক্তির উত্থান কীভাবে একটি গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালাতে পারে।

বুরুঙ্গা গণহত্যা শুধু একটি গ্রামের নিরীহ মানুষের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন। এই গণহত্যার ভয়াবহতা আমাদের শেখায় যে, স্বাধীনতা ও মানবতার মূল্য কত চড়া এবং কী ভয়াবহ মূল্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘বিদ্যুৎ বিভাগে ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে গেছে আওয়ামী লীগ’

‘বিদ্যুৎ বিভাগে ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে গেছে আওয়ামী লীগ’

রোনালদো নন, ফরাসি তারকার চোখে পর্তুগালের সেরা ব্রুনো

রোনালদো নন, ফরাসি তারকার চোখে পর্তুগালের সেরা ব্রুনো

ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ ঢাকা, গাছ উপড়ে পড়ায় ভোগান্তি

ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ ঢাকা, গাছ উপড়ে পড়ায় ভোগান্তি

বিশ্বকাপে ইরানকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিল মেক্সিকো

বিশ্বকাপে ইরানকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিল মেক্সিকো

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App