নববর্ষ পালনের গল্পকথা
ফারজানা তাসমীম হালিমা
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
নববর্ষ পালনের গল্পকথা
পুরনোকে বিদায়, নতুনকে স্বাগত- এই চিরন্তন আহ্বান নিয়েই বার বার ফিরে বাংলা নববর্ষ। পহেলা বৈশাখ- একটি নতুন দিনের সূচনা, এক অনুভূতি, এক আবেগ, এক শিকড়ের টান। বছরের প্রথম প্রভাতে সূর্যের আলো যখন ধীরে ধীরে বাংলার মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যেন নতুন করে জেগে ওঠে মানুষের আশা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। গত বছরের সব ক্লান্তি, ব্যর্থতা আর গ্লানি পেছনে ফেলে নতুন করে পথচলার এক অদৃশ্য অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয় সবাই।
গ্রামবাংলার কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানের মাঠ কিংবা শহরের ব্যস্ত ইট-পাথরের দেয়াল- সব জায়গাতেই এই দিনটি নিয়ে আসে এক আলাদা আমেজ। কারও পাতে থাকে পান্তা-ইলিশ, কারও মনে থাকে নতুন বছরের নতুন পরিকল্পনা, আবার কোথাও বাজে ঢোল, গাওয়া হয় গান। এই বহুমাত্রিক উদযাপনই প্রমাণ করে; পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই প্রাণের উৎসবের শুরুটা কোথা থেকে?
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে আমরা ফিরে যাই মোগল আমলে। সুবাহবাংলার শাসনভার তখন সম্রাট আকবরে কাঁধে ন্যাস্ত। তখন এই অঞ্চলে খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সন অনুযায়ী, যা ছিল চাঁদের গতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বছরের সময়সূচি কৃষি মৌসুমের সঙ্গে মিলত না। কৃষকের ফসল উঠার আগেই অনেক সময় খাজনা দিতে হতো, যা তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল বড় এক সমস্যার কারণ। এই বাস্তব সংকট থেকেই এক নতুন সময়পঞ্জির প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে। সংকট সমাধানে সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন সৌরভিত্তিক একটি সন, যা পরিচিত হয় ‘ফসলি সন’ নামে। সময়ের প্রবাহে এই ফসলি সনই ক্রমে বিকশিত হয়ে আজকের বাংলা সনের রূপ নেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকের জীবনযাত্রাকে সহজ করা। ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে খাজনা আদায়ের সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব ব্যবস্থাও যাতে আরো সুশৃঙ্খল ও সময়োপযোগী হয় সেই ব্যবস্থা করা।
শুরুর দিকে এই নববর্ষ ছিল মূলত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। কৃষকরা ফসল ঘরে তোলার পর খাজনা পরিশোধ করত, আর সেই নির্দিষ্ট সময়টিই একপর্যায়ে পরিণত হয় আনন্দ, মিলন ও উৎসবের উপলক্ষ্যে। এভাবেই হিসাব-নিকাশের বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয় এক প্রাণবন্ত সামাজিক উৎসবের। গ্রামে গ্রামে শুরু হয় আনন্দ আয়োজন। নতুন ধানের ঘ্রাণ, পিঠা-পুলি, লোকজ গান, নৌকা বাইচ-সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ।
একইভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও গড়ে ওঠে হালখাতা প্রথা। পুরোনো বছরের হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার এই রীতিও ধীরে ধীরে পরিণত হয় নববর্ষের এক অবিচ্ছেদ্য আয়োজনে। দোকানে দোকানে মিষ্টিমুখ, গ্রাহকদের আমন্ত্রণ, সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক সামাজিক বন্ধনের অংশ। ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির সীমা পেরিয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে সর্বজনীন উৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শুরু হলেও পরবর্তীতে মুসলিম ব্যবসায়ীরাও এই প্রথাকে গ্রহণ করে। ফলে এটি এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পায়। আজকের দিনে পহেলা বৈশাখ শুধুই খাজনা বা হিসাবের বিষয় নয়; এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব। শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা, গ্রামে লোকজ আয়োজন, সব মিলিয়ে এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগের একটি দিন।
লেখক : সাংবাদিক
