×

বিশেষ সংখ্যা

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

Icon

কামরুজ্জামান আরিফ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১০ পিএম

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির আবেগ-অনুভূতির পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। নতুন বছরকে স্বাগত জানানো আর পুরাতনকে বিদায়ের এই সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে বাঙালির জীবনে অন্যতম উৎসবের। বলা যায়, পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক ও ধারক। এটি কোটি বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলাদেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যাপক সাড়ম্বরে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। তবে, অনেক বাঙালিই জানেন না এই পহেলা বৈশাখ উৎসব কবে থেকে শুরু হয়েছিল? কে এর প্রচলন করেছিলেন? পান্তা ভাত-ইলিশ কিভাবে পহেলা বৈশাখের ট্রেন্ডে পরিণত হলো? পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কী? পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে হালখাতা কিভাবে এলো? ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাই বা পহেলা বৈশাখের এই উৎসবে কিভাবে জড়িয়ে গেলো? 

পহেলা বৈশাখের রীতিনীতি, উৎসব আবহমান বাংলার এক অনন্য সংযোজন। শহর থেকে গ্রামে, দেশ থেকে বিদেশে সব বাঙালিই মেতে উঠে আনন্দ নতুন বছর আগমনের এই  উল্লাসে। তরুণদের গায়ে নতুন লাল-সাদা পাঞ্জাবী, তরুণীদের পরনে শাড়ি, খোঁপায় ফুল, হাতভর্তি কাচের চুড়ি। বাচ্চারা রঙিন জামা পরে মেলায় যাওয়ার বায়না ধরে। বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে থাকে বাঙালির ঐতিহ্যের দই-মিষ্টি, বিন্নি ধানের খৈ, মোয়া, সন্দেশ, ভাত, তরকারি, ডাল, পান্তাভাত। থাকে হরেক রকম ভর্তা, ইলিশ মাছ ভাজি, ঠান্ডা পানীয় ইত্যাদি।

পহেলা বৈশাখ ও শোভাযাত্রা 

শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অংশ। সারা দেশের মানুষের চোখ থাকে এই শোভাযাত্রার উপর। এর থিম ও নাম নিয়ে যদিও আলোচনা সমালোচনা হয় প্রতিবছরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়।  শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের নানা অনুসঙ্গ। ১৯৮৯ সাল থেকে এই শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখে চালু রয়েছে।

বৈশাখী মেলা

বৈশাখ মাস মানেই মেলা। গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গাতেই বৈশাখী মেলা বসে। তবে পার্থক্য থাকে গ্রামের আর শহুরে মেলার। বিভিন্ন জেলায় হয় শত বছরের পুরোনো মেলা। বাঁশ-বেতের তৈজস আর নানা জাতের খেলার সামগ্রী। নারকেল মুড়কিসহ আরো কত কী থাকে এসব মেলায়, লিখে শেষ করা যাবে না। এসব মেলাকে ঘিরে সময়ে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তির আসরও বসে।

ইতিহাস ঐতিহ্যের হালখাতা

হালখাতা প্রাচীন বর্ষবরণের একটা রীতি। আগের দিনের কৃষকেরা চাষাবাদ বাবদ চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা ও শুল্ক পরিশোধ করে দিত। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ ভূমির মালিকরা তাদের প্রজাসাধারণের জন্য মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।  যা পরবর্তীতে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানিরা সারা বছরের বাকির খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে দোকান সাজায়। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা। এ উৎসবগুলো সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে প্রতিটি বাঙালির ঘরে। এখনো গ্রামগঞ্জে নববর্ষে হালখাতার হিড়িক পড়ে বাজার, বন্দর ও গঞ্জে।

পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ

পহেলা বৈশাখে বর্তমানে পান্তা-ইলিশ খাওয়া হলেও, আগে এর প্রচলন ছিল না। এইদিন ভালো খাবার খাওয়ার চল ছিল। যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল মাছ, মাংস, পোলাও। ধারণা করা হয়, পহেলা বৈশাখ বা বছরের প্রথম দিনে যদি ভালো খাবার খাওয়া হয়। ভাল পোশাক পরা হয় তাহলে বছরজুড়েই ভাল পোশাক, ভাল খাবার পাওয়া যাবে। কিন্তু,পান্তা একটি কর্পোরেট ধারণা এবং পহেলা বৈশাখে এটি আসে ২০০০ সালের পর। পান্তা ভাতের সাথে গরম কিছু হলে খেতে ভাল লাগে, এ চিন্তা থেকে ইলিশ পহেলা বৈশাখে যুক্ত হয়। এটি আসলে একটি সংযোজন। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো পান্তা ভাত। বাঙালির ঐতিহ্য পান্তা নয়, এখনো গ্রামে পহেলা বৈশাখে যদি আমরা খোঁজ করি, গ্রামের মানুষ ওই দিন পান্তা খায় না, ওই দিন তারা ভাল খায়।

প্রবাসীদের বর্ষবরণ

বর্ষবরণের এ মেলা শুধু দেশে অনুষ্ঠিত হয় এমনটি নয়, প্রবাসীদের জন্য হয় এক অন্যরকম মিলনমেলা। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। বিভিন্ন দেশে প্রতি বছরই অনেক ঘটা করে প্রবাসি বাংলাদেশিদের উদ্দ্যেগে বিশাল পরিসরে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। প্রবাসীদের এ মিলনমেলার রেশটা থাকে সারা বছর। এ ছাড়া নিউইয়র্ক, লন্ডন, কানাডাসহ বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় শহরে বসে বৈশাখী মেলার আয়োজন।

আজকের দিনে পয়লা বৈশাখ অনেকের কাছে শুধুই সেলফি-সেশন, গান-নাচের সময়। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো জানাটাই আসল উদযাপন। ঐতিহ্যকে বুঝে তার সম্মান করা—এটাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সুতরাং আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে—আপনি কোনটি উদ্যাপন করছেন? ঐতিহ্য-এতিহ্য, নাকি বর্তমান বাস্তবতা!

লেখক: হেড অব অনলাইন এন্ড ডিজিটাল, ভোরের কাগজ

টাইমলাইন: পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App