অ্যামেচার রেডিও: দুর্যোগ মোকাবেলার প্রযুক্তিতে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে

আইরিন খাতুন
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫, ০৮:০৯ এএম

অ্যামেচার রেডিও। ফাইল ছবি
দেশে শখের বেতার যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে পরিচিত অ্যামেচার বা হ্যাম রেডিওর প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে যখন প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ায় তরুণরা এর প্রতি ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সাম্প্রতিক লাইসেন্স পরীক্ষার পরিসংখ্যান এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত হ্যাম রেডিও লাইসেন্স পরীক্ষায় ৭৯৪ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ (সেবার পরীক্ষার্থী ছিলেন ৪১০ জন)। যদিও আবেদনকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে, পাসের পরিসংখ্যানে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ২০২৩ সালে যেখানে ৪১০ জনের মধ্যে ৩৪৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন (পাসের হার ৮৫%), সেখানে এবছর ৭৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৬৫ জন, অর্থাৎ পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশে।
হ্যাম রেডিও মূলত একটি অ-বাণিজ্যিক বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো প্রকার খরচ ছাড়াই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে, এমনকি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মহাকাশচারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব।
অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এআরএবি) সাধারণ সম্পাদক অনুপ কুমার ভৌমিক বলেন, “সাম্প্রতিক বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও অপটিক্যাল ফাইবার অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন স্বেচ্ছাসেবী হ্যাম অপারেটররা দুর্গত এলাকায় জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রেখেছেন। তারা শুধু তথ্য আদান-প্রদানই করেননি, বরং উদ্ধার অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছেন। এই কার্যকর ভূমিকার কারণেই তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী এখন এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হচ্ছেন।”
ক্রমবর্ধমান আগ্রহের বিপরীতে এই খাতে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে, যা অনেককে নিরুৎসাহিত করছে। অনুপ কুমার ভৌমিক জানান, লাইসেন্স পরীক্ষার ফি বৃদ্ধি, একাধিকবার পুলিশ ভেরিফিকেশনের জটিলতা এবং প্রতিবছর নিয়মিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়াটা আগ্রহীদের জন্য একটি বড় বাধা। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের পর আবার ২০২৫ সালে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এ বিষয়ে বিটিআরসি-এর একটি সূত্র জানায়, পরীক্ষা আয়োজনে কেন্দ্র ভাড়া, প্রশ্নপত্র মুদ্রণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মানি প্রদানের ক্ষেত্রে বাজেট সংকট থাকায় পরীক্ষার ফি বৃদ্ধি করতে হয়েছে। সরকারের জন্য এটি সরাসরি কোনো রাজস্ব আয়ের উৎস না হওয়ায় নিয়মিতভাবে পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না।
বিটিআরসি-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় হ্যাম রেডিও ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনও কম। তবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। একারণে এবারের পরীক্ষায় ন্যূনতম বয়সসীমা ১৮ বছর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান বাধ্যতামূলক করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি অবস্থায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষায় হ্যাম রেডিও এক অনন্য ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। উন্নত দেশগুলোতে হ্যাম অপারেটরদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে তাদের নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশেও হ্যামদের সংগঠিত করে তাদের দক্ষতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অ্যামেচার রেডিওর মতো প্রযুক্তির প্রতি তরুণদের এই আগ্রহ একটি দেশকে শুধু প্রযুক্তিনির্ভরই করবে না, বরং দুর্যোগ-সহনশীল একটি সক্ষম জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
তরুণদের মধ্যে হ্যাম রেডিওর প্রতি আগ্রহ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে পরীক্ষার ফি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, নিয়মিত পরীক্ষা আয়োজন এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একটি সমন্বিত সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে হ্যাম অপারেটরদের দক্ষতা ও নেটওয়ার্ককে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।