×

তথ্যপ্রযুক্তি

অফলাইন রাইড শেয়ারিং: যাতায়াত ব্যবস্থায় অপরাধ বাড়ার শঙ্কা

Icon

মিজানুর রহমান সোহেল

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫, ০১:২৫ পিএম

অফলাইন রাইড শেয়ারিং: যাতায়াত ব্যবস্থায় অপরাধ বাড়ার শঙ্কা

অফলাইন রাইড শেয়ারিং। প্রতীকী ছবি

দেশজুড়ে অনলাইন রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো শহরের যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও, এর সমান্তরালে ‘অফলাইন রাইড’ নামক এক অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতির প্রসার ঘটছে। অ্যাপ বা কোনো ডিজিটাল মাধ্যমের বাইরে চালক ও যাত্রীর সরাসরি চুক্তিতে সম্পন্ন হওয়া এই ভ্রমণগুলো উভয়ের জন্যই সৃষ্টি করছে মারাত্মক নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি। বেশি আয় এবং ভাড়ার লোভে চালক ও যাত্রীরা এই ব্যবস্থাকে বেছে নিলেও এর পরিণতি কখনো কখনো হয়ে উঠছে ভয়াবহ।

যাত্রীদের ঝুঁকি: ছিনতাই থেকে ধর্ষণ

অফলাইন রাইডের ক্ষেত্রে যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির শিকার হন। যেহেতু এই রাইডগুলোর কোনো ডিজিটাল রেকর্ড থাকে না, তাই চালকের পরিচয় যাচাই বা যাত্রাপথ ট্র্যাক করার কোনো উপায় থাকে না। অপরাধপ্রবণ চালকরা এই সুযোগটিই গ্রহণ করে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা অফলাইন রাইডের অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত করেছে। গত ৪ জুন এক নারী বিউটি পার্লার থেকে বাড়ি ফেরার জন্য একজন চালকের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিতে মোটরসাইকেলে ওঠেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারান এবং যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি নিজেকে ঢাকার বাইরের একটি মহাসড়কে আবিষ্কার করেন, যেখানে তিনি ধর্ষণের শিকার হন। পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, যাচাই-বাছাই ছাড়া অপরিচিত চালকের সঙ্গে অফলাইন যাত্রা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।

একইভাবে, ছিনতাইয়ের ঘটনাও অহরহ ঘটছে। শিক্ষিকা তারজুয়ানার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তিনি রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়, যাতে মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিল। তদন্তে দেখা যায়, এ ধরনের অপরাধে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলগুলোর অনেকেই রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, যারা সুযোগ বুঝে ছিনতাই করে।

অপরাধী চক্রগুলো একটি নির্দিষ্ট কৌশলে কাজ করে। তারা রাইড শেয়ারিং অ্যাপে নিবন্ধিত থাকলেও অ্যাপের মাধ্যমে আসা অনুরোধ গ্রহণ করে না। বরং যাত্রীর অবস্থান জেনে নিয়ে অ্যাপটি বন্ধ করে দেয় এবং সরাসরি যাত্রীর কাছে গিয়ে অ্যাপের চেয়ে কম ভাড়ায় যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। অনেক যাত্রী কম ভাড়ার লোভে এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান এবং ছিনতাই বা অন্য কোনো বিপদের শিকার হন।

চালকদের ঝুঁকি: যাত্রীরূপী ছিনতাইকারী

অফলাইন রাইডে শুধু যাত্রীরাই নন, চালকরাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা অপরাধীরাও চালকদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। এমনই একটি ঘটনা ঘটে পূর্বাচলের ১০ নম্বর সেক্টরে। একজন যাত্রী অফলাইন রাইড নিয়ে চালককে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে বাইকটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সে চালকের চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয়। সৌভাগ্যবশত, চালকের চিৎকারে আশেপাশের মানুষ ছুটে এসে ছিনতাইকারীকে আটক করে। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে, কোনো রেকর্ড না থাকায় চালকরাও যাত্রীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হতে পারেন এবং প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কেন অফলাইন রাইড এত ঝুঁকিপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অফলাইন রাইডের ঝুঁকিগুলো বহুমাত্রিক:

ট্র্যাকিং-এর অভাব: রাইডের কোনো ডিজিটাল রেকর্ড না থাকায় অপরাধীকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পরিচয় যাচাইহীনতা: চালক বা যাত্রীর প্রোফাইল, রেটিং বা পূর্ববর্তী রেকর্ড দেখার কোনো সুযোগ থাকে না।

নিরাপত্তা কভারেজের অনুপস্থিতি: দুর্ঘটনা ঘটলে কোনো পক্ষই রাইড শেয়ারিং কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা বীমা সুবিধা পায় না।

ভাড়া নিয়ে বিবাদ: নির্ধারিত ভাড়া না থাকায় যাত্রা শেষে চালক ও যাত্রীর মধ্যে প্রায়ই ভাড়া নিয়ে তর্ক বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

রাজস্ব ক্ষতি: অফলাইন রাইডের কোনো হিসাব না থাকায় চালকরা সহজেই কর ফাঁকি দেন, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির একটি বড় কারণ।

রাইড শেয়ারিংয়ের ব্যাপকতা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ

রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখের বেশি চালক রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। শুধুমাত্র গত বছরেই ঢাকায় ১ লাখ ৪ হাজার ৫৪টি নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। পাঠাও-এর তথ্যমতে, সারাদেশে তাদের প্রায় আড়াই লাখ চালক রয়েছে, যার একটি বড় অংশই ঢাকায় সক্রিয়। এছাড়া উবার, ওভাই, সহজ-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে।

তবে রাইড শেয়ারিংয়ের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধও। ২০১৭ সাল থেকে উবার চালকের অশ্লীল আচরণ, গাড়িতে তরুণী ধর্ষণ, চালকের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং মাদক বহনের মতো বিভিন্ন অভিযোগে রাইড শেয়ারিং পরিষেবাগুলো বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অফলাইন রাইডের এই প্রবণতা সেই ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

পরিশেষে, অফলাইন রাইড উভয় পক্ষের জন্য সাময়িক সুবিধা বয়ে আনলেও এর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর। একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অফলাইন রাইডের ঝুঁকি সম্পর্কে চালক ও যাত্রী উভয়কেই সচেতন হওয়া অপরিহার্য।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নুরের খোঁজ নিলেন রাষ্ট্রপতি, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস

নুরের খোঁজ নিলেন রাষ্ট্রপতি, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস

পুলিশ অ্যাকটিভ হলে সবাই বলে বেশি করে ফেলেছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

পুলিশ অ্যাকটিভ হলে সবাই বলে বেশি করে ফেলেছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

ইসরায়েলের হামলায় প্রধানমন্ত্রীর নিহতের খবর নিশ্চিত করল হুতি

ইসরায়েলের হামলায় প্রধানমন্ত্রীর নিহতের খবর নিশ্চিত করল হুতি

রাকসু নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষ, আহত তিন শিক্ষার্থী

রাকসু নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষ, আহত তিন শিক্ষার্থী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App