অদৃশ্য শক্তির গল্প: দায় এড়ানো নাকি নতুন রাজনৈতিক কৌশল?
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
অদৃশ্য শক্তির গল্প: দায় এড়ানো নাকি নতুন রাজনৈতিক কৌশল?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে- দেশকে কি পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে একটি অরাজনৈতিক বা অন্তর্বর্তী কাঠামোর অধীনে রাখা এবং সেই ব্যবস্থার নেতৃত্বে মুহাম্মদ ইউনুস-কে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, বরং এটি রাজনৈতিক বক্তব্য, সন্দেহ, আংশিক তথ্য এবং ব্যাখ্যার এক জটিল মিশ্রণ।
এই ধারণাটি যেভাবে সামনে এসেছে, তা মূলত কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের মাধ্যমে। যেমন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দাবি করেছেন, একটি অজ্ঞাত ‘ডিপ স্টেট’ অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। একইসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হাদিকে হত্যা করেছে ইডিপ স্টেট। এসব বক্তব্য এক ধরনের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করছে, যেখানে একটি অদৃশ্য শক্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ধারণা দেওয়া হচ্ছে।
যদি সত্যিই এমন কোনো পরিকল্পনা থেকে থাকে, তাহলে তার জন্য প্রয়োজন হতো অত্যন্ত শক্তিশালী, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক শক্তি, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনিক স্তরের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সমঝোতা থাকতে হতো। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, এমন সমন্বিত ও দীর্ঘস্থায়ী গোপন ঐকমত্য তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট যে, একটি একক ‘মাস্টার প্ল্যান’ দীর্ঘ সময় গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব।
মুহাম্মদ ইউনুস-কে কেন্দ্র করে যে ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, তিনি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন তাও এখন সামনে চলে এসেছে। খোদ ইউনুসের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছিলেন, জনগণ তাদের পাঁচ বছরের জন্য চায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে নির্বাচন দিতে তাদের আগ্রহ ছিল না।
তবে আসিফের বয়ানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো শক্তিকে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তার কথায় বোঝা যায় একটি অরাজনৈতিক সরকারের আড়ালে প্রকৃত ক্ষমতা এই দুই শক্তির হাতে থাকত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এমন একটি ব্যবস্থায় অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বা অন্য শক্তিগুলো কি সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় থাকত?
এসব কথায় ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে বিশ্লেষণ দেওয়া হচ্ছে যে এটি পরিকল্পিতভাবে ‘ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে পরিচালিত হয়েছিল। অর্থাৎ পুরো আন্দোলনকে একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখার জায়গা তৈরি হয়েছে এসব কথায়।
‘ডিপ স্টেট’ ধারণাটি নিজেই একটি জটিল ও বিতর্কিত বিষয়। বিশ্ব রাজনীতিতে এটি ব্যবহৃত হয় এমন এক অদৃশ্য শক্তি বোঝাতে, যারা নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই ধারণা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে যখন কোনো পক্ষ নিজেদের ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করতে চায় বা প্রতিপক্ষকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। বাংলাদেশের বর্তমান আলোচনাতেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট।
দেশকে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক সরকারের বাইরে রেখে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অধীনে পরিচালনা করার ধারণাটি পুরোপুরি অমূলক বলা যায় না, কারণ ইতিহাসে বিভিন্ন দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস এবং বয়ান নির্মাণের একটি অংশ বলেই বেশি মনে হয়।
সুতরাং, প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, এমন কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এই ধরনের বয়ান কে, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে তৈরি করছে। গণতান্ত্রিক সমাজে সত্য খুঁজে বের করার একমাত্র পথ হলো প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সরাসরি এটি স্বীকার করেননি যে,তাদের পরিচালিত করছিল কোনো ‘বিরাজনীতিকরণের শক্তি’। তবে তার বক্তব্য এমন একটি ইঙ্গিত তৈরি করে, যেটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
তিনি যা বলেছেন, সেটির মূল কাঠামো ছিল- একটি তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ তাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল, নির্দিষ্ট শর্ত মানলে সরকারকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখা যেতে পারে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রস্তাব পাওয়ার দাবি করা আর সেই প্রস্তাব অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া - দুটো এক জিনিস নয়। আসিফ মাহমুদের বক্তব্য প্রথমটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি বলেননি যে, তারা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন বা সেই শক্তির অধীনে কাজ করেছেন।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্যকে কেউ কেউ এইভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, একটি শক্তি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমিয়ে নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা চেয়েছিল। এই ধরনের বক্তব্য সাধারণত দুইভাবে ব্যবহৃত হতে পারে: একদিকে এটি দেখাতে পারে যে, তারা চাপের মুখে ছিলেন।
অন্যদিকে এটি একটি অদৃশ্য শক্তির ধারণা তৈরি করে, যা রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগও দেয় আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া-এর বক্তব্যকে যদি কেবল সরলভাবে না দেখে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে কয়েকটি সম্ভাব্য কৌশলগত উদ্দেশ্য বা ব্যাখ্যা সামনে আসে। এগুলো নিশ্চিত সত্য নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ ও বয়ান বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সম্ভাব্য পাঠ।
প্রথমত, দায় এড়ানোর কৌশল। যখন কোনো অন্তর্বর্তী বা অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে, তখন একটি “অদৃশ্য চাপ” বা “ডিপ স্টেট” এর কথা তুলে ধরা একটি পরিচিত কৌশল। এর মাধ্যমে বোঝানো যায়, “সব সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছিল না”। এতে করে ভবিষ্যতের সমালোচনা কিছুটা হলেও প্রশমিত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, নৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা। এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে একটি ইমেজ তৈরি করা সম্ভব- যে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েও তা গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ, তারা গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সরাসরি না বললেও, এই ইঙ্গিতটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি। যখন ‘ডিপ স্টেট’কে অস্পষ্ট রাখা হয়, তখন সেটি এক ধরনের “খালি ফ্রেম” হয়ে যায়, যেখানে মানুষ নিজের মতো করে শত্রু কল্পনা বসিয়ে নিতে পারে। এতে করে বিভিন্ন পক্ষ, দেশীয় বা আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠান, সবাইকে সন্দেহের আওতায় আনা যায়, সরাসরি নাম না নিয়েই।
চতুর্থত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মেরুকরণে ভূমিকা। এই বয়ানটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে রাজনীতি “স্বাভাবিক বনাম অস্বাভাবিক শক্তি” এই দ্বৈততায় দাঁড়িয়ে যায়। এতে করে যে কোনো পক্ষ নিজেকে “স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক শক্তি” হিসেবে তুলে ধরতে পারে, আর প্রতিপক্ষকে “গোপন শক্তির সুবিধাভোগী” হিসেবে দেখাতে পারে।
পঞ্চমত, আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে দেওয়া। বাস্তব নীতিগত ব্যর্থতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা বা রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা না করে “ডিপ স্টেট” ইস্যুকে সামনে আনা হলে জন-আলোচনার ফোকাস বদলে যায়। এতে করে কঠিন প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যেতে পারে।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বয়ানে প্রায়ই বিদেশি শক্তির প্রভাবের প্রসঙ্গ আসে। ‘ডিপ স্টেট’ ধারণাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখলে সেটিকে সহজেই আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এতে করে একটি বড় ও জটিল ষড়যন্ত্রের ধারণা তৈরি হয়, যা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও প্রমাণ করা কঠিন।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্যকে সরাসরি “স্বীকারোক্তি” হিসেবে না দেখে বরং একটি কৌশলগত রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত, যার লক্ষ্য শুধু অতীত ব্যাখ্যা করা নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা।
লেখক: সাংবাদিক
