ঋণবহর ও বাজেটঘাটতি: আর্থিক স্থিতিশীলতার পথচিত্র
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ঋণবহর ও বাজেটঘাটতি: আর্থিক স্থিতিশীলতার পথচিত্র
দেশ এখন এমন এক মোড়ে এসেছে যেখানে সরকারি খরচ বাড়ছে, রাজস্ব বাড়ছে না এবং আবার ঋণের বোঝাও বাড়ছে। সামনের কয়েক মাসে তেল-গ্যাসের দাম বাড়বে বিধায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে যে অতিরিক্ত খরচ হবে, তা প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এটাই বর্তমান সংকটের কড়া বাস্তবতা।
অন্যদিকে এনবিআর সেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছুতেই পারছে না। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুল্ক-কর আদায় প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম। সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এনবিআর থেকে। আর এই উৎসই দুর্বল হলে সমগ্র বাজেট ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রাজস্ব না বাড়লে পরিচালন ব্যয়, সামাজিক ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ-সব মিলিয়ে টাকাটা ঘন চক্রেই ঢুকে পড়ে। বর্তমানে সরকারের মোট ঋণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা; এর মধ্যে বিদেশি উৎসে আছে ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার, যা টাকায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার মতো। সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকি উৎস মিলিয়ে দেশে তোলা ঋণের পরিমাণ এত বেশি যে, সুদ পরিশোধেই বাজেটের বড় একটি অংশ কেটে যায়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প থেমে যায়। কাটছাট হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের র মতো জনগণের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত সব খাত।
দেশের আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা এবং ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বিনিয়োগ বাড়া জন্য সুদের হার কমাবে, ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সব পরিকল্পনাকে ঝামেলায় ফেলেছে। সুদহার কমানো নিয়ে কথাও হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি এমনিতেই অনিশ্চিত যে সেই উদ্যোগ স্থগিত আছে। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ততটা বাড়ছে না। আবার সরকার বড় পরিমাণ ঋণ নিলে বাজারে ধার নেওয়ার সুযোগ কমে যায়; ফলে ধারদেনার হার বাড়ে এবং সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হয় না। এমন ক্রেডিট ক্রাউডিং আউট অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ঘটায়।
একটাই স্বস্তির খবর আছে এবং তা হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালোই থাকছে। আর সে কারণে কারণে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কিছুটা শক্ত হয়েছে। এক মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে না; ফলে ব্যাঙ্কগুলোর কাছে শতকোটি ডলারের মতো তরলতা রয়েছে এবং রিজার্ভ আছে প্রায় ৩৪.৪৭ বিলিয়ন ডলার। তবে খারাপ খবর হলো রপ্তানি আয় টানা আট মাস ধরে নেতিবাচক এবং এই আট মাসের ৭ মাসই ছিল ইউনুস শাসনামলের।
তাই রেমিঠ্যান্স আর রিজার্ভ বিষয়টি সাময়িক। বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান না। বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষত বৈশ্বিক সুদবৃদ্ধি বা মুদ্রার ওঠানামার সময়ে।
সব মিলিয়ে কীভাবে এই চাপ কমানো যাবে? সরল ভাষায় বলা যায়: তিনটি কাজ ত্বরান্বয়ে করতে হবে-রাজস্ব বাড়ানো, সরকারের চলতি ব্যয় কমানো, এবং ঋণের গঠন পুনর্বিন্যাস। এনবিআরের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে; করফাঁকির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া, ভ্যাট-আইটেমের আপডেট ও ডিজিটাল রেকর্ডিং বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে, খরচের অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি ও ব্যয় পেছনে ফেলে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো রক্ষা করতে হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন মানেই কাগজে সব কাজ দেওয়া নয়; তা করতে গেলে টার্গেটেড প্রোগ্রাম ও বায়-ব্যাক পরিকল্পনা দরকার।
অন্যতর এক জরুরি দিক হলো ভর্তুকি-কে টার্গেট করা। বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে সাধারণ জনগণের জন্য ভর্তুকি রাখা লাগবেই, কিন্তু সেটা সঠিকভাবে দিতে হবে। অর্থাৎ ধনী ব্যবহারকারীদের জন্য সর্বজনীন ভর্তুকি বন্ধ করে দরিদ্র ও শিল্পগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সাহায্য দিতে হবে। কৃষি খাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে; কৃষিঋণ মওকুফ বা কৃষি কার্ড চালু করলে তারও টেকসই পরিকল্পনা দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন বাড়ে এবং সাপোর্ট খরচ কমে।
বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার সময় দীর্ঘমেয়াদি, সাশ্রয়ী সুদের বন্ড ইস্যু করতে হবে; বিশেষ নিলাম কমিয়ে নিয়মিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইস্যু করলে বাজারে অস্থিরতা কমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রীকে ব্যাংকিং সেক্টরের সঙ্গে সমন্বয় করে তারল্য বজায় রাখতে হবে যাতে বেসরকারি অংশে ক্রেডিট-ক্রাউডিং কমে। দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে ব্যাংকিং খাত শক্ত করার উদ্যোগ করা হচ্ছে। তাও জরুরি; কিন্তু তার দ্রুত প্রভাব পেতে সময় লাগে এবং তা বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
সংক্ষেপে, কোনো অল্টিমেটো বা দ্রুত সমাধান নেই। সময়োপযোগী, স্বচ্ছ এবং কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া ঋণের বোঝা একটু একটু করে বাড়তেই থাকবে। সরকারের সামনে এখন কঠিন কিন্তু অপরিহার্য কাজ-আয় বাড়ানো ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ একই সঙ্গে করা। তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। দেশে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে রাজনীতি ও প্রশাসনে একটু বেশি ত্যাগ, তীব্র বাস্তববাদ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন-নইলে ঋণের জট দ্রুত গভীর হবে।
লেখক: সাংবাদিক
