যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা, রুমমেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০০ পিএম
জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা (ইউএসএফ) এ অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হত্যার অভিযোগে লিমনের রুমমেট গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের দপ্তর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর সিএনএনের।
২৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার দায়ে হিশাম আবুঘারবিয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মরদেহ গোপন করা, মৃত্যুর খবর গোপন রাখা, আলামত নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং শারীরিক হামলার অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত সপ্তাহ থেকে নিখোঁজ ছিলেন ২৭ বছর বয়সী এই দুই শিক্ষার্থী। শুক্রবার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে নাহিদা বৃষ্টির তখনো সন্ধান মেলেনি। ঘটনাস্থল ও সন্দেহভাজনের বাসা থেকে উদ্ধার করা রক্তের আলামতের ভিত্তিতে পুলিশ ধারণা করছিল তিনিও নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
হিলসবরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা, যা পুরো কমিউনিটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আরো পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যায় গ্রেপ্তার আবুগারবিয়েহকে নিয়ে যা জানা গেল
তদন্ত কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, লিমনের মরদেহ উদ্ধারের আগেই হিশামকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শুক্রবার সকালে টাম্পার উত্তরে তার পরিবারের বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার ফোন পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। পুলিশ পৌঁছালে হিশাম ঘরের ভেতর নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং বের হতে অস্বীকৃতি জানান। পরে পুলিশ তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে সোয়াট টিমকে ডাকা হয়। দীর্ঘ উত্তেজনার পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন।
শনিবার তাকে আদালতে তোলা হয়। আগামী ২৮ এপ্রিল তার প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ততদিন তাকে জামিন ছাড়াই কারাগারে রাখা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ জানায়, তদন্তকারীরা বিভিন্ন সূত্র ধরে কাজ করছেন। ঘটনাটির পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ সংলগ্ন পানিতে ডাইভ টিম বৃষ্টির সন্ধানে অভিযান পরিচালনা করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, লিমনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন শিগগির প্রকাশ করা হতে পারে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল সকালে নিজ বাসার কাছে সর্বশেষ দেখা যায় জামিল লিমনকে। এক ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শেষবার দেখা যায় নাহিদা বৃষ্টিকে। পরদিন যোগাযোগ না পেয়ে পরিবারের এক বন্ধু বিষয়টি পুলিশকে জানান। এরপর থেকেই তাদের খোঁজে অভিযান শুরু হয়।
জামিল লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বলেন, “আমরা সত্যটা জানতে চাই। সবাই আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।” পরিবারের সদস্যরা জানান, লিমন ছিলেন মেধাবী ও স্বপ্নবাজ এক গবেষক। পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরিকল্পনা ছিল তার।
অন্যদিকে, নাহিদা বৃষ্টিকে তার সহপাঠীরা প্রাণবন্ত ও মেধাবী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এসিসিই) বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
ইউএসএফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটি ক্যাম্পাসের বাইরে ঘটেছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার ওপর কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি নেই। শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আদালত ও শেরিফ অফিসের নথি অনুযায়ী, হিশাম আবুগারবিয়েহ ইউএসএফের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তবে গ্রেপ্তারের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না।
২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত এবং একটি জনশূন্য বাড়িতে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও তখন এসব অভিযোগ তুলনামূলকভাবে লঘু অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
হিলসবোরো কাউন্টি আদালতের নথিতে আরো দেখা যায়, পারিবারিক সহিংসতার কারণে তার বিরুদ্ধে পরিবারের এক সদস্য দুটি ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইনজাংশন’ বা সুরক্ষা আদেশের আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি আদালত মঞ্জুর করেছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তদন্ত চলমান রয়েছে এবং নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
