দারিদ্র ও চিকিৎসাহীনতা
২২ বছর ধরে শিকলবন্দি আবুল খায়ের
রায়হান চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কোমরে শিকলবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক আবুল খায়ের। চিকিৎসার অভাব, চরম দারিদ্র্য ও সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় তার জীবন থমকে আছে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মধ্যেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৮ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় আবুল খায়েরের। বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কখনো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে আশপাশের মানুষকে মারধর করতেন, আবার কখনো স্থানীয়দের বিরক্ত করতেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বাধ্য হয়ে তাকে শিকলবন্দি করেন তার বাবা নুর মিয়া।
সেই থেকেই শুরু হয় আবুল খায়েরের বন্দি জীবন। এরই মধ্যে প্রায় ১৫ বছর আগে মারা যান তার বাবা-মা। সন্তান না থাকায় আগেই তাকে ছেড়ে চলে যান স্ত্রীও। আপন কোনো ভাই না থাকায় বর্তমানে তার একমাত্র ভরসা চাচাতো ভাই ও সিএনজি চালক আব্দুর রহমান।
আব্দুর রহমান জানান, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আবুল খায়েরকে দেখাশোনা করছেন তিনি। বাবার রেখে যাওয়া অর্ধ শতাংশ জায়গার ওপর একটি ছোট্ট টিনের ঘর নির্মাণ করে সেখানে রাখা হয়েছে তাকে। কিন্তু অভাব-অনটনের সংসারে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় আবুল খায়েরকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতার কথা বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি নেয়নি। এরপর আর চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিন কোমরে শিকল বাঁধা থাকায় বর্তমানে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না আবুল খায়ের। তবুও তার স্বজনদের বিশ্বাস, সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন তিনি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মানবিক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বিত্তবানদের দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে একসময় শারীরিকভাবেও সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়বেন আবুল খায়ের।
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.বি.এম সারোয়ার রাব্বী বলেন, “যদি এমন কোনো ব্যক্তি থেকে থাকে, তাহলে সমাজসেবা অফিসের সহায়তায় আমরা তার পাশে দাঁড়াব এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।”
