হরমুজ প্রণালি বন্ধ
খাদ্য সংকটের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে টানা ৩৯ দিন ধরে চলমান সংঘাতে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি এই কৌশলগত পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটই ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতির কেবল শুরু। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ব্যবসা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং খাদ্যবাজারে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব শিগগিরই খাদ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে এবং সংঘাত শেষ হলেও এই উচ্চমূল্য কিছু সময় স্থায়ী হতে পারে। খবর এনডিটিভির।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও এই পথ ব্যবহার করে, যা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক কৃষি নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়ে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের ওপর। কিন্তু সার সরবরাহে বিলম্ব বা উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন সারের ব্যবহার কমাতে, কম জমিতে চাষ করতে অথবা কম সার প্রয়োজন এমন ফসল বেছে নিতে। এর ফলে সামগ্রিক উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য, পশুখাদ্য ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
এর প্রভাব ভুট্টার বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। ভুট্টার দাম বাড়লে তা সরাসরি গরুর মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের খরচ বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ ব্যবহার করে তৈরি কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরো পড়ুন : ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর আরো বাড়ল তেলের দাম
বিশ্বের প্রধান তিনটি খাদ্যশস্য—ভুট্টা, গম ও চাল—মানবজাতির মোট ক্যালরির অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ করে। এই ফসলগুলোর উৎপাদনের জন্য নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই তিনটির সরবরাহ কমে গেছে এবং দাম বেড়েছে।
নাইট্রোজেন সার উৎপাদনের ব্যয়ের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। যুদ্ধের কারণে এর উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে এবং দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে রাশিয়া নিজেদের মজুদ রক্ষায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রপ্তানি স্থগিত করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের বৃহত্তম ফসফেট উৎপাদক চীন ফসফেট রপ্তানি বন্ধ করায় বৈশ্বিক সরবরাহে প্রায় ২৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পটাশিয়ামের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে, বিশেষ করে বেলারুশ ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আগেই সরবরাহ কমে গিয়েছিল।
ফলে বিশ্বজুড়ে সারের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর মাত্র এক মাসের মধ্যে কিছু সারের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
এর প্রথম ধাক্কা লাগে কৃষকদের ওপর। ধানজাতীয় ফসল তাদের অধিকাংশ নাইট্রোজেন প্রয়োজন বৃদ্ধি পর্যায়ের শুরুতেই গ্রহণ করে। পরে সার প্রয়োগ করলে তা কম কার্যকর হয়। নাইট্রোজেন ১০–১৫ শতাংশ কম ব্যবহার করলে বা ২–৪ সপ্তাহ দেরিতে প্রয়োগ করলে ভুট্টার ফলন ১০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ভুট্টা ও গমের উৎপাদন কমে গেলে তা শুধু মানুষের খাদ্য নয়, পশুখাদ্যের সরবরাহেও প্রভাব ফেলে। ফলে পশুপালনের খরচ বাড়ে এবং মাংস ও প্রাণিজ পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা ভবিষ্যতের উৎপাদনের জন্য রাখা গবাদিপশুও বিক্রি বা জবাই করতে বাধ্য হন।
এর উদাহরণ হিসেবে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে খরা ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে গরুর সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য, যা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ সংকট তৈরি করেছিল। একইভাবে ২০১২ সালে ভুট্টার ফলন কমে যাওয়ায় পশুখাদ্যের দাম বাড়ে এবং মুরগির মাংসের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে সারের সরবরাহ স্বাভাবিকের প্রায় ৭৫ শতাংশে নেমে আসে। এই সময় কৃষকরা জমি প্রস্তুত ও সার প্রয়োগ শুরু করেন। ফলে প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত সার না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক ভুট্টার পরিবর্তে কম সার প্রয়োজন এমন সয়াবিন চাষের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা ভুট্টার সরবরাহ আরো কমিয়ে দেবে। সরকারি সহায়তা বা ঋণ কিছুটা আর্থিক চাপ কমাতে পারলেও সরবরাহ সংকটের সমাধান করতে পারে না।
অবশেষে এর প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো তীব্র সংকট দেখা দেয়নি, তবে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বেড়েছে, আর খাদ্যের দাম কিছুটা দেরিতে বাড়লেও তা প্রায় অনিবার্য।
বিশ্ববাজারের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রও প্রভাবিত হবে। ২০২৬ সালে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চীন ও ভারতের মতো দেশে পশুখাদ্যের চাহিদা বাড়ায় ভুট্টার বৈশ্বিক দাম আরো বাড়তে পারে।
সাধারণত খামার পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব পাইকারি বাজারে দ্রুত পড়লেও খুচরা বাজারে তা পৌঁছাতে ২ থেকে ৪ মাস সময় লাগে। কম প্রক্রিয়াজাত ভুট্টাজাত পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, তবে সিরিয়াল বা মুরগির মাংসের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগে। গরুর মাংসের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও দেরিতে দেখা যায়।
পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচ বৃদ্ধিও পরোক্ষভাবে খাদ্যের দাম বাড়ায়। ইতোমধ্যে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ আরোপ করা হচ্ছে।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, কারণ তারা আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও বাসস্থানে ব্যয় করে। ফলে তুলনামূলক সস্তা প্রোটিন যেমন মুরগিও তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সারের মূল্য ও সরবরাহ সংকট একটি সম্ভাব্য খাদ্য জরুরি অবস্থার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে ৩০ কোটির বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য পায় না। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আশঙ্কা করছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও ৪৫ মিলিয়ন মানুষ এতে যুক্ত হতে পারে।
ভারত ও ব্রাজিলে ২০২৬ সালে ফসল উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। পূর্ব আফ্রিকার কৃষকরা আগে থেকেই উচ্চ সারের দামে চাপে ছিল, এখন তাদের পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
যদিও এসব সমস্যা অনেকের কাছে দূরের মনে হতে পারে, তবে খাদ্যের বাজার বৈশ্বিক—এবং যুদ্ধজনিত এই অতিরিক্ত ব্যয় খুব শিগগিরই সবার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে।
