সমুদ্রে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিত করতে গুরুত্বারোপ প্রধান উপদেষ্টার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বঙ্গোপসাগরের তলদেশে প্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের অস্বাভাবিক আধিক্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় সমপরিমাণ জলভাগ থাকলেও এই বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ এখনো যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা জাহাজ ‘আরভি ডক্টর ফ্রিডজফ ন্যানসেন’-এর মাধ্যমে পরিচালিত এই জরিপের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানীর অংশগ্রহণে এ জরিপ পরিচালিত হয়, যাদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বৈঠকে গবেষণার উপাত্ত তুলে ধরেন।
তিনি জানান, গবেষণায় ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে একই সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট চিত্রও উঠে এসেছে। অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে, যা পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ। মূলত অতিরিক্ত মাছ আহরণ বা ওভারফিশিংয়ের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, দুই হাজার মিটার গভীরতাতেও প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং অপেক্ষাকৃত অগভীর পানিতেও মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বৈঠকে জানানো হয়, গভীর সমুদ্রে বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ট্রলার মাছ ধরলেও এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার ‘সোনার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক মাছ আহরণ করছে। এই আগ্রাসী পদ্ধতিতে বড় মাছ ধরা পড়লেও ক্ষুদ্র জেলেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘এভাবে টার্গেটেড ফিশিং চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিংয়ের বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।’
তবে গবেষণায় টুনা মাছের আধিক্য ও সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি ‘ফিশিং নার্সারি’র সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সামুদ্রিক সম্পদকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে হলে গবেষণা জোরদার করার পাশাপাশি কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। বৈঠকে আরো জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়েল নেভির একটি বহুমুখী সার্ভে ভেসেল ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা সমুদ্র গবেষণায় দেশের সক্ষমতা বাড়াবে।
তিনি জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে সামুদ্রিক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
