×

শিশুস্বাস্থ্য

হামের প্রকোপ

মৃত্যুতে শীর্ষে বাংলাদেশ

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৪:২১ পিএম

মৃত্যুতে শীর্ষে বাংলাদেশ

ছবি : সংগৃহীত

হামে মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের বদলে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হাম পরিস্থিতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য আগেই সতর্ক করেছিল। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে হামের এ নতুন প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল দ্য ল্যানসেট এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে।

দেশে চলতি বছরের শুরুতেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে ১৫ মার্চ থেকে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গে এবং নিশ্চিত হামে দেশে ৫২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই শিশু। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর বিশ্বে অনেক দেশেই হামের পুনরুত্থান দেখা দিয়েছে। তবে এত মৃত্যু কোথাও হয়নি। হামে মৃত্যুর দিক দিয়ে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, হাম ও এই রোগের উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সুদানে। সেখানে মৃতের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত ৪শ ছাড়ায়নি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানেও মৃতের সংখ্যা শতকের ঘর ছুঁয়নি।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিসেফ আগেই বাংলাদেশকে সতর্ক করেছিল- এমন দাবি করে আসছিল আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান পহেলা মে ফেসবুকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে ইউনিসেফের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। পোস্টে তিনি লিখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এর মূল্য পরে পরিশোধ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ইউনিসেফ ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, হাম পরিস্থিতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা অন্তত ৫ থেকে চিঠি দিয়েছিল এবং এছাড়া বিভিন্ন বৈঠকে অন্তত ১০ বার সতর্ক করেছিল। তবে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান তার এক সাক্ষাৎকারে ইউনিসেফের এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন।

আরো পড়ুন : নোয়াখালীতে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু

বাংলাদেশে কেন হামের প্রকোপ এতটা ভয়াবহ হলো- তা বের করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত’ করার জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে সরকার। এ বিষয়ে সংস্থাটির কাছ থেকে ইতিবাচক জবাব পাওয়া গেছে বলে সস্প্রতি এক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। এর আগে স্বাস্থ্য সচিব ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সরকার। কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো বা এক্ষেত্রে কারো কোনো গাফিলতি ছিল কিনা, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমদ ভোরের কাগজকে বলছেন, এই যুগে পাঁচ শতাধিক শিশুর এভাবে মৃত্যু অকল্পনীয়। শুরুতেই এর ব্যাপকতা অনুধাবন করে মহামারি ঘোষণা করে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিলে এত মৃত্যু হয়তো আমাদের দেখতে হতো না। সময়মতো টিকা না পাওয়ায় শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে সময়মতো টিকাও আসেনি। সময়মতো আসেনি অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে। এছাড়া মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য শুরুতেই কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা ও জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করা উচিত ছিল। প্রতিটি মৃত্যু শুরু থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে অডিট করলে পরবর্তীতে মৃত্যু ঠেকাতে করণীয় খুঁজে পেতে সহায়ক হতো। এগুলোর কোনো কিছুই হয়নি। সে কারণেই এতগুলোর শিশুর মৃত্যু দেখতে হলো। 

রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ব, রোগের প্রাদুর্ভাব ও মহামারি-বিষয়ক বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে এই জনস্বাস্থ্যবিদের। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরো এক থেকে দুই মাস থাকবে। এরপর কমতে শুরু করবে। 

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, হামে আক্রান্তের একটি অন্যতম কারণ কিন্তু অপুষ্টি। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে হিমশিম খায় সেখানে কীভাবে তারা পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করবে? বস্তিবাসী কেউ হামের লক্ষণ নিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে, হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে বাসায় নিয়ে যান পরিস্থিতির অবনতি হলে নিয়ে আসবেন। এর মানে কী? আমরা অবনতির দিকে কাউকে ঠেলে দিচ্ছি? বস্তিতে কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ যেখানে ঠিকমতো তিনবেলা খেতে পারে না তারা কীভাবে বাড়িতে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে কোয়ারেন্টাইন করবে? এই সমস্যার সমাধানে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন জরুরি। একই সঙ্গে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে একটি কর্মকৌশলের আলোকে কাজ করতে হবে।

টিকাদান কার্যক্রমের কিছু অসঙ্গতির কথাও বলেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বিগত সময়ে এ ধরনের ক্যাম্পেইনের জন্য যেভাবে মাইক্রোপ্ল্যান করে প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতো, এবার তা নিখুঁতভাবে করা হয়নি। যে কারণে সরকারি লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও অনেক শিশু রয়ে গেছে, যারা আসলে টিকা পাওয়ার উপযুক্ত ছিল কিন্তু বাদ পড়েছে। এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, হাম এবার সম্পূর্ণ নতুন নতুন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ক্লাস্টারে সীমাবদ্ধ থাকলে এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। এছাড়া টিকাদান কার্যক্রমটি ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ অর্থাৎ আক্রান্ত এলাকার চারপাশকে বিশেষ কর্ডন করে গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

এদিকে শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিশেষ ক্যাম্পেইনের মেয়াদ ২০ মে শেষ হলেও টিকাদান কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। বৃহস্পতিবার আমরা দেশের সব সিভিল সার্জন, হাসপাতালের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়কদের সঙ্গে জুম মিটিং করেছি। আমি নির্দেশ দিয়েছি, ২১ মে থেকে আমাদের নতুন পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যতদিন না দেশের একটি শেষ শিশুও টিকার বাইরে থাকবে, ততদিন খুঁজে খুঁজে টিকাদান এবং মাইকিং কার্যক্রম চলমান থাকবে। এটি এখন একটি নিয়মিত ও চলমান প্রক্রিয়া। 

আরো ১৬ শিশুর মৃত্যু

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ( শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ১০, ময়মনসিংহে ২ এবং রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে একজন করে মারা গেছে। এ সময় নতুন করে ১ হাজার ৪৩৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২৮ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। আর হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ১ হাজার ৩০৬ জনের শরীরে। যাদের মধ্যে ১ হাজার ১৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

গতকাল রবিবার হামের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৪২ জন মারা গেছে। সব মিলিয়ে ৫২৮ জন শিশুর মৃত্যু হলো। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭৪ জন ঢাকায় মারা গেছে; আর ৮০ জন রাজশাহী বিভাগের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৬ হাজার ২১৪ জন ছাড়পত্র পেয়েছে। আর নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬২২ জন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ঈদের জন্য খোলা হলো মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজার নতুন ৫ লেন

ঈদের জন্য খোলা হলো মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজার নতুন ৫ লেন

ভেনেজুয়েলায় কারাগার দখলে নিলেন বন্দিরা

ভেনেজুয়েলায় কারাগার দখলে নিলেন বন্দিরা

জার্মান পাসপোর্ট পেলেন রেকর্ডসংখ্যক মানুষ

জার্মান পাসপোর্ট পেলেন রেকর্ডসংখ্যক মানুষ

শরণখোলায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

শরণখোলায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App