চিকেনস নেক নিয়ে ভারতের নতুন কৌশল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’কে ঘিরে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। সীমান্ত নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একসঙ্গে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গকে বিশেষ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। চিকেনস নেক নামে পরিচিত এই সরু ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে নেপাল ও ভুটানের সীমান্ত ঘেরা এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। বিশেষ করে চীন সীমান্তের নিকটবর্তী তিব্বতের চুম্বি উপত্যকাকে কেন্দ্র করে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই এলাকার গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
সম্প্রতি উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, আসামের ধুবড়ি এবং বিহারের কিষানগঞ্জ এলাকায় নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরির খবর সামনে এসেছে। একই সঙ্গে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
আরো পড়ুন : ভারতের উত্তর প্রদেশে ঈদের নামাজ ও কোরবানি নিয়ে নতুন নির্দেশনা
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এসব পদক্ষেপ শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নয় বরং উত্তরবঙ্গকে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ। শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতল অঞ্চলকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ কৌশলগত অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় সীমান্তবর্তী সড়কগুলোকে চার লেনে উন্নীত করা, বিকল্প পাহাড়ি রাস্তা তৈরি, বিমানবন্দর ও রেল অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য আরো বৃদ্ধি পাবে। শিলিগুড়ি তখন একটি বড় পণ্য পরিবহণ ও গুদামজাত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। গোয়েন্দা মহলের একাংশের মতে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে চিকেনস নেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বরং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনও জরুরি।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বঞ্চনা, অনুন্নয়ন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিযোগ রয়েছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে সামনে আনছে কেন্দ্রীয় সরকার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানা গেছে।
নতুন শিল্পনগরী, আধুনিক হাসপাতাল, প্রযুক্তি কেন্দ্র এবং পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে। এতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেন্দ্রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ কিছুটা সহজ হয়েছে। আগে কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে বহু প্রকল্প আটকে ছিল বলে দাবি করা হয়। বর্তমানে সেই বাধা অনেকটাই কমেছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে উত্তরবঙ্গকে অতিরিক্ত সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা স্থানীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে উত্তরবঙ্গকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত করার প্রস্তুতি চলছে। ফলে আগামী দিনে চিকেনস নেক শুধু সীমান্ত নয়, ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
