হরমুজের তলদেশে ইরানের নতুন শক্তির খেলা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক প্রভাব বিস্তারের পর এবার বিশ্ব অর্থনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দিকে নজর দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন বা সমুদ্রগর্ভস্থ ইন্টারনেট ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে তেহরান।
এই ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে ইউরোপ, এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান হয়। ইরান এখন এসব ক্যাবল ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের চিন্তা করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তেহরানের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যে এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন, যার আওতায় আরব অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী সাবমেরিন ক্যাবলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, নির্ধারিত ফি পরিশোধ না করলে ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত হতে পারে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর ফি আরোপের ঘোষণা দেন। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোর দাবি, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও আমাজনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের নতুন নিয়ম মেনে চলতে হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাবমেরিন ক্যাবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্সিং ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ক্যাবলের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব কেবল ইরানি কোম্পানির মাধ্যমে সম্পন্ন করার শর্তও আরোপ করা হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ইরানকে অর্থ প্রদান করা আইনগতভাবে জটিল। ফলে অনেকে এই পদক্ষেপকে বাস্তব প্রয়োগের চেয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। এতে শুধু ইন্টারনেটের গতি কমবে না, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, ক্লাউড অবকাঠামো, অনলাইন স্ট্রিমিং ও ফ্রিল্যান্সিং খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, এটি মূলত ইরানের কৌশলগত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে ভবিষ্যৎ সামরিক হুমকি নিরুৎসাহিত করাই তেহরানের লক্ষ্য।
বর্তমানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক অপারেটর নিরাপত্তার কারণে ওমানের জলসীমা ব্যবহার করলেও ‘ফ্যালকন’ ও ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই)’ নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়েই গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি এসব ক্যাবলের ওপর হামলা চালায়, তাহলে তা বহু মহাদেশজুড়ে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এর প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে শুরু করে ভারতের আউটসোর্সিং শিল্প এবং সিঙ্গাপুর-ইউরোপের আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
ইরান অবশ্য ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের আলোকে নিজেদের অবস্থানকে বৈধ দাবি করছে। দেশটি মিশরের সুয়েজ খালের উদাহরণও টানছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুয়েজ খাল একটি কৃত্রিম জলপথ হলেও হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক নৌপথ- ফলে দুই ক্ষেত্রের আইনি কাঠামো এক নয়।
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ইরিনি পাপানিকোলৌপোলুর মতে, বিদ্যমান ক্যাবল সংক্রান্ত আগের চুক্তিগুলো ইরানকে মেনে চলতে হবে। তবে নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে নিজস্ব জলসীমায় শর্ত আরোপের কিছু অধিকার রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের এই নতুন কৌশল ভবিষ্যতে শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
