অস্থায়ী দোকানের জায়গা বণ্টন নিয়ে শঙ্কা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:১৬ এএম
ছবি: ভোরের কাগজ
‘এত জায়গায় তালিকা দিলাম, সহায়তা মিলবে তো?’
‘ও সাংবাদিক ভাই, এইডা আমার দোকান। কিচ্ছু অবশিষ্ট নাই। আগুন লাগার পরের দিন থেকে ৪ জায়গায় ফরমপূরণ করে দোকানের তালিকা দিছি। ৫ দিন হয়ে গেল এক টাকাও সহায়তা পাই নাই। আমার ফোন নম্বরটা রাখেন। যদি কোনো উপায় হয় বা কেউ সহায়তা করতে চায় একটু জানায়েন’। গতকাল শনিবার দুপুরে নিজের ভস্মীভূত দোকানের উপর দাঁড়িয়ে পোড়া কাপড় হাতড়াতে হাতড়াতে কথাগুলো বলছিলেন মো. আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে এক কিশোর এসে বলে, আবারো নতুন করে তালিকা নিচ্ছে। দোকানের নম্বর, আর নিজের নাম লেখিয়ে আসেন। তালিকার কথা শুনে কর্মচারীর হাত থেকে ফাইল নিয়ে নাম লেখাতে যাওয়ার সময় আনোয়ার হোসেন বলতে থাকেন, ‘এত জায়গায় তালিকা দিলাম, সহায়তা মিলবেতো?’
আনোয়ার হোসেনের মতোই এখনো কোনো সহায়তা না পাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন মো. মুরাদ হোসেন। তিনি বলেন, আপাতত আমাদের একমাত্র চাওয়া, ভিটেটা (দোকানের জায়গা) ফেরত চাই। কারণ, যত দ্রুত দোকান শুরু করতে পারব, আমাদের জন্য ততই ভালো। তবে, ভিটে বুঝিয়ে দিলে সব ব্যবসায়ীকে জায়গা বণ্টনে শঙ্কা দেখা দেবে। কেননা, এই জমিতে সর্বোচ্চ এক হাজার ব্যবসায়ীকে অস্থায়ী দোকান বসাতে দেয়া যাবে। অথচ এই জায়গার ওপর থাকা ৪ মার্কেটে ব্যবসায়ী আছে আড়াই হাজারেরও বেশি। এদিকে এখনো পুড়ে যাওয়া অর্ধেক মালামালও সরাতে পারেনি সিটি করপোরেশন। কবে নাগাত মালামাল পরিষ্কার শেষ হবে এটিরও নিশ্চয়তা নেই। যদিও মালিক সমিতি বলছে, যেদিন মালামাল পরিষ্কার শেষ হবে, তার পরের দিনই অস্থায়ী দোকান বসতে দেয়া হবে।
আলাপচারিতায় মো. আনোয়ার হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, বঙ্গ কমপ্লেক্সে তার চারটি দোকান। দোকানগুলো পুড়ে যাওয়ায় তার ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে ১৪ লাখ টাকা লোন নিয়ে নতুন মালামাল তুলেছিলেন।
তাও শেষ। এই অবস্থায় সহায়তা পাইলে কিছুটা হলেও উপকার হতো। কিন্তু আগুন লাগার পরের দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসন, মালিক সমিতি ও থানা পুলিশের কাছে তালিকা জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে আশায় তালিকা দিয়ে বেড়াচ্ছি, সেটি পূরণ হচ্ছে না। সরকারকে অনুরোধ করব, আমাদের দ্রুত সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করুন। আনোয়ার হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশন যে গতিতে জায়গা পরিষ্কার করছে, তাতে এক সপ্তাহে পরিষ্কার হবে কিনা সন্দেহ। আর পরিষ্কার না হলে আমরা দোকানও বসাতে পারব না।
গতকাল শনিবার সরজমিন দেখা যায়, বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ দিন পার হলেও এখনো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বাজারসংলগ্ন আশপাশের এলাকায় ছড়িয়েছে কাপড়ের পোড়া গন্ধ। দোকানের মালামাল সরিয়ে নেয়ার কাজ এখনো চলছে। জিডি করার জন্য পুলিশের বসানো অস্থায়ী ক্যাম্প ও জেলা প্রশাসনের অস্থায়ী সহায়তা তথ্যকেন্দ্রে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ লাইন। জেলা প্রশাসনের তালিকায় নাম দিতে ব্যবসায়ীরা নিজ দোকানের নাম, জেলা প্রশাসন থেকে দেয়া ফরম, ভোটার আইডি, ট্রেড লাইসেন্স এবং দোকানের নাম বা দোকানের ভিজিটিং কার্ড এনেছেন। কারো কারো ট্রেড লাইসেন্স দোকানেই পুড়ে গেছে। তারা শুধু ভোটার আইডি আর দোকানের ভিজিটিং কার্ড নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
অপরদিকে, গতকাল ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা এরই মধ্যে পুড়ে যাওয়া দোকানের টিন, লোহা, গ্রিল, শাটারসহ অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করেছি। তা থেকে ৪০ লাখ টাকা এসেছে। এ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় খোলা হিসাব নম্বরে দেয়া হবে। আরো সহায়তা নিয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে জমা দেব। যেগুলো পরে মেয়রের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।
কবে নাগাদ ব্যবসায়ীরা দোকানে বসতে পারবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে জহিরুল ইসলাম বলেন, আজ কাজ শেষ হলে কালই মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করে দোকান বসানো হবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন ও বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হুদাসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের ৪৮টি ইউনিট কাজ করে। সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলও নির্বাপণে সময় লাগে ৭৫ ঘণ্টা। এখনো সেখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে।
