পুলিশের নতুন আইজিপি
তিন দশক ধরে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক যোদ্ধা
ফেরদৌস আরেফীন
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
ছবি: নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের সপ্তম দিনে এসে রাষ্ট্রের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ‘বাংলাদেশ পুলিশ’-এর সর্বোচ্চ পদে নতুন একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিলো।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন মো. আলী হোসেন ফকির, যিনি এর আগে আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন (এপিবিএন) প্রধানের (অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদায়) দায়িত্বে ছিলেন।
বাংলাদেশ পুলিশে ‘রাজনৈতিক কারণ’ উল্লেখ করে ওএসডি, চাকরিচ্যুতি, প্রমোশন, ডিমোশন ইত্যাদি খুবই সাধারণ ঘটনা; এবং রাষ্ট্রের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় পুলিশে এর হার নিঃসন্দেহে কয়েকশগুণ বেশি।
অতীতে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, ‘পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো’ নামকরণের আড়ালে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যের ক্যারিয়ার নিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশি মতোেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে বদলি, পদায়ন, প্রমোশন, ডিমোশন, ওএসডির 'বন্যা' বইয়ে দিয়েছে আমাদের বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক দল।
বাংলাদেশ পুলিশের নয়া আইজিপি আলী হোসেন ফকির ওই রাজনীতি-সৃষ্ট ‘বন্যায়’ বারবার ভেসে গিয়েও, পাল্টা স্রোতে প্রতিবারই পুনরায় ডাঙায় ফিরে আসা আলোচিত একটি নাম।
আর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে বিকম অনার্স, এমকম এবং এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করা এই মেধাবী বিসিএস কর্মকর্তার পুরো চাকরি জীবনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীটির নাম ‘রাজনৈতিক কারণ’।
ক্ষমতার পালাবদলের কারণে সৃষ্ট তথাকথিত ‘রাজনৈতিক কারণে’; চাকরি যাওয়া-আসার খেলায় আলী হোসেন ফকির চাকরিচ্যুত হয়েছেন দুই দফায়, আবার দাপটের সাথে ফিরেও এসেছেন দুই দফায়। আরো মজার বিষয় হলো, ১৯৯৫ সালে নিয়োগ পাওয়া বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা তাঁর চাকরি জীবনের ৩০ বছরের মধ্যে প্রায় ১০ বছর কাটিয়েছেন ‘চাকরিচ্যুত’ অবস্থায়, আর ওএসডি অবস্থায় কাটিয়েছেন আরও ১৩ বছর। অর্থাৎ, পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেশ সেবার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৭ বছর। বিসিএস ক্যাডার হয়েও ৩০ বছরের দীর্ঘ চাকরি জীবনে পদোন্নতি পেয়েছেন মাত্র একবার।
আলী হোসেন ফকিরের পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে অদ্ভুত আর বিস্ময়কর সব উত্থান-পতনের পথচলায় প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় থাকা কী সেই ‘রাজনৈতিক কারণ’? এর খোঁজ নিতে গেলে যা জানা গেলো, সেটাকে একজন বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তার বারবার ‘চাকরিচ্যুত’ হবার মতো নূন্যতম যৌক্তিক কোনো কারণ হিসেবে ভাবলে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়।
আলী হোসেন ফকিরের গাঁয়ের বাড়ি বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলার রণবিজয়পুর গ্রামে। সেই একই গ্রামের সন্তান বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু সালেহ মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, যিনি কর্নেল মুস্তাফিজ নামে অধিক পরিচিত। ১৯৯১-৯৬ এই ৫ বছর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে থাকা বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এ এস এম মুস্তাফিজুর রহমানের ভাগ্নে এই আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা আলী হোসেন ফকির, কর্নেল মুস্তাফিজের আপন ছোটবোনের পুত্র তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য একজন প্রভাবশালী নেতার আপন ভাগ্নে হিসেবে জন্মগ্রহণই হচ্ছে আমাদের নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের পুরো চাকরি জীবন নিয়ন্ত্রণ করা সেই তথাকথিক ‘রাজনৈতিক কারণ’।
ক্যারিয়ার পাথ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে বিসিএস উত্তীর্ণ পুলিশের এএসপি পদে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র বছর দেড়েকের মাথায় প্রথমবারের মতো ক্ষমতার পালাবদলের শিকার হন আলী হোসেন ফকির। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ‘রাজনৈতিক কারণ’ দেখিয়ে প্রথমবারের মতো ‘চাকরিচ্যুত’ করে।
এর ৫ বছর পর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় তাকে চাকরিতে বহাল করে। এপর্যায়ে তিনি একধাপ পদোন্নতি পেয়ে এসপি হিসেবে দেশের একাধিক জেলায় পদায়ন পান এবং চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে বেশ পরিচিতিও লাভ করেন। ২০০৮ সালে ডিএমপির উত্তরা জোনের ডিসি থাকা অবস্থায় জাতিসংঘ মিশনে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি।
বছর চারেক কসোভো ও আইভরিকোস্টে শান্তিরক্ষা মিশন সেরে দেশে ফেরার পর রাজশাহী পুলিশের বিভাগীয় কার্যালয়ে (ডিআইজি অফিসে) পুলিশ সুপার পদমর্জাদায় ‘ওএসডি কর্মকর্তা’ হিসেবে সংযুক্ত করা হয় তাকে। তিন বছর পর সেখান থেকে ওই একই পুলিশ সুপার পদমর্জাদায় ‘ওএসডি কর্মকর্তা’ হিসেবেই সংযুক্ত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় খুলনা বিভাগীয় এপিবিএন কার্যালয়ে।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে একই পদে ওএসডি অবস্থায় পড়ে থাকতে-থাকতেই, ২০২২ সালে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগ সরকার আবারও সেই ‘রাজনৈতিক কারণ’ দেখিয়ে এপর্যায়ে আলী হোসেন ফকিরকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়, এবং এতে করে একরকম চাকরি জীবনের সমাপ্তিই ঘটে যায় তাঁর জীবনে।
কিন্তু দুই বছর কাটতে না কাটতেই, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উচ্চ-আদলেতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুলিশ সুপার বা এসপি পদমর্যাদাতেই চাকরি ফিরে পান আলী হোসেন ফকির। চৌকস পুলিশ অফিসার হিসেবে সুপরিচিতি থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তা ‘সুপার নিউমারারি ডিআইজি’ হিসেবে পদোন্নতিও পান এই দফায়, পোস্টিং পান এপিবিএন প্রধানের পদে।
বারবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের অপরাজনৈতিক-বিকৃতির শিকার হয়ে ৩০ বছরের চাকরি জীবনে মোটের ওপর মাত্র দু’বার পদোন্নতি পাওয়া আলোচিত পুলিশ অফিসার আলী হোসেন ফকির আজ এই মুহূর্তে বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান চেয়ারটিতে বসা।
শুধু তাই নয়, এখন তিনি একাধারে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১৫তম বিসিএস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, ১৫তম বিসিএস পুলিশ ফোরামের আহ্বায়ক, খুলনা ক্লাব এবং ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সদস্য।
ব্যক্তিজীবনে আলী হোসেন ফকিরের সহধর্মিণী প্রফেসর নাসিমা ফেরদৌসী সরকারি তিতুমীর কলেজে ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত। তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র কুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আর কন্যা বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়ণরত।
প্রবাদ আছে ‘প্রকৃতি যে কোনো মূল্যে শূণ্যস্থান পূরণ করে’। আলী হোসেন ফকিরের আজকের এই সার্বিক অবস্থান অনেকটাই যেন তাঁর জীবন জুড়ে বারংবার ঘটে যাওয়া তথাকথিত ‘রাজনৈতিক কারণে’ সৃষ্ট চাকরিহীনতা আর পদোন্নতি-বঞ্চণার বিশাল-বিসৃত শূণ্যতা পূরণের মতোই নয় কী?
