২৫ মার্চ
অন্ধকারের সেই রাত, একটি জাতির জেগে ওঠার ইতিহাস
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
আজ ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস । দিনটি এলেই ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায় নতুন করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ১৯৭১ সালের এই রাতে বাঙালি জাতির ওপর নেমে এসেছিল এক পরিকল্পিত গণহত্যা, যা শুধু একটি শহর বা অঞ্চল নয়; সমগ্র জাতির অস্তিত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল।
সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে চলছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা দেখায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দমনে সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ মধ্যরাতে শুরু হয় ভয়াবহ সামরিক অভিযান অপারেশন সার্চলাইট। সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক, মর্টার ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে হামলা চালানো হয়।
সবচেয়ে নির্মম আঘাত আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ছাত্র-শিক্ষকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলায় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। জগন্নাথ হল পরিণত হয় রক্তাক্ত হত্যাক্ষেত্রে। একই সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় চালানো হামলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা বাহিনীকে নির্মমভাবে দমন করা হয়।
এই অভিযান ছিল সুপরিকল্পিত। এর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের নিশ্চিহ্ন করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে।
পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর নির্মম গুলিতে শহীদ হন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ অনেকেই। রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও রক্ষা পাননি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা থেকে।
অভিযান শুরুর আগেই ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। একই রাতে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে গ্রেপ্তারের পূর্বেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা বাঙালি জাতিকে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করে।
২৫ মার্চের এই নৃশংসতা বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং ঐক্যবদ্ধ করেছে। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ৯ মাসব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পর অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
দিবসটি আজ শুধু শোকের নয়, বরং স্মরণ, শ্রদ্ধা এবং সচেতনতার দিন। ২০১৭ সালে সরকারিভাবে ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে এবং শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারে।
আজকের প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জন যেমন কঠিন ছিল, তেমনি তা রক্ষা করাও দায়িত্বের। ইতিহাসের এই দিনটি আমাদের শিখিয়ে দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানবতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা। ২৫ মার্চের অন্ধকার রাত তাই কেবল শোকের প্রতীক নয়; এটি বাঙালির জাগরণ, প্রতিরোধ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের সূচনাও।
