দিল্লিতে গঙ্গা চুক্তি ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে আলোচনাই হয়নি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির পক্ষ থেকে পৃথক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গঙ্গা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনা উঠে এসেছে কি না, তা কোনো পক্ষের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি। সে কারণে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি-না তা অস্পষ্ট রয়েছে।
বুধবার দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ পুরীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এর আগের দিন মঙ্গলবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারা।
বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক বিবৃতি দেওয়া হয়। এসব বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন হত্যাকারীদেরও ফেরত চাওয়া হয়।
এছাড়া ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বৈঠকে ভারতের ভিসা নিয়েও আলোচনায় এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে।
একই সঙ্গে বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয়পক্ষের সুবিধার ভিত্তিতে তার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে বলেও দিল্লিকে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ঢাকা।
চলতি বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এই চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই চুক্তি নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখন উভয় দেশের পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে এই চুক্তি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। ফারাক্কা ব্যারাজে পানির প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে প্রতি ১০ দিন অন্তর পর্যায়ক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি বণ্টন করা হয়। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে তা সমান ভাগে ভাগ করা হয়। তবে দিল্লিতে দুই দেশের মন্ত্রীদের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কেননা কোনো পক্ষের বিবৃতিতে বিষয়টি আসেনি।
এদিকে বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত হত্যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কেননা ভারত সীমান্তে প্রায়ই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। উভয় দেশই সীমান্ত হত্যার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তবে তারপরেও সীমান্ত হত্যা থেমে নেই। এ বিষয়েও বিবৃতিতে কোনো কিছু আসেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.খলিলুর রহমানের সফরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত হত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন আলোচনায় আসেনি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এটি ছিলো ভারতে প্রথম সফর। এটি মূলত ছিলো শুভেচ্ছা সফর। এমন সফরে এক বৈঠকেই সব ইস্যুতে আলোচনা সম্ভব নয়, অথবা অনেক কিছু আলোচনা হলেও কৌশলগত কারণে সবকিছু বিবৃতিতে আসে না। এই কর্মকর্তা আরো জানান, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের সব ইস্যু সাধারণত আলোচনায় আসে না। তবে সচিব পর্যায়ে যখন দুই দেশের মধ্যে ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) বৈঠক হয়ে থাকে, তখন গুরুত্বপূর্ণ সব ইস্যুই আলোচনা হয়ে থাকে। ভারতের সঙ্গে আগামীতে এফওসি হলে, নিশ্চয়ই সব ইস্যুতে আলোচনা হবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন- পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড.খলিলুর রহমানের সফরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত হত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন আলোচনায় আসেনি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সফরটি ছিল শুভেচ্ছা সফর। এটা ছিলো দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলানোর প্রথম ধাপ। সে কারণেই হয়তো সব ইস্যুগুলো আলোচনায় আসেনি। তবে গঙ্গা চুক্তি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ইস্যু। এই চুক্তি নবায়নে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এছাড়া এখানে আরো একটি বিষয় রয়েছে যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই দিল্লি হয়ে গেছেন। সে কারণেই সব বিষয়ে কথা বলার মতো প্রস্তুতিও হয়তো ছিলো না। তবে আশার কথা হলো, তিনি আলোচনা শুরুটা করে দিয়েছেন। আগামীতে যখন বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক হবে, তখন নিশ্চয়ই এসব ইস্যু আলোচনায় আসবে।
উল্লেখ্য, তিন দিনের সফরে ৭ এপ্রিল দিল্লি গেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফরে গেলেন। দিল্লি থেকে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দিতে মরিশাস যাবেন। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে আগামী ১০-১২ এপ্রিল ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে।
