জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি
‘বিএনপির সরকার গঠন জাপান-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
সাইদা শিনিচি। ফাইল ছবি
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নানা ধরনের দেশগঠনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে গেছে, যদিও এক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্য দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়েছে। সফল এই রাজনৈতিক উত্তরণ সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক অর্জন। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণকে এ উপলক্ষে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
জাপান–বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জাপান একটি বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'কৌশলগত অংশীদারিত্ব' (স্ট্রাটেজিক পার্টনারশিপ) রূপরেখার আওতায় দুই দেশের এ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময়েও, এ ইতিবাচক ধারাকে ব্যাহত না করে জাপান সবসময়ের মতোই বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে আসছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নতুন সরকার গঠন দ্বিপক্ষীয় এ সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এরই মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সমৃদ্ধির কৌশল নিয়ে তার কর্মপন্থা তুলে ধরেছেন। গত এপ্রিলের শেষ দিকে, জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্যমন্ত্রী নরিকাজু সুজুকি ঢাকা সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময়, তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির লেখা একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন এবং বিএনপির নতুন সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন এবং 'কৌশলগত অংশীদারিত্ব'-এর আওতায় এ সরকারের সঙ্গেও সব ধরনের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে জাপানের অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া, 'অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স' (ওএসএ) রূপরেখার আওতায় জাপান চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে কয়েকটি পেট্রোল বোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে বলতে গেলে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার না করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত জাপান–বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) আমাদের দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। জাপান দূতাবাস সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং এ দেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আরও প্রবৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিভিন্ন খাতে সহায়তা প্রদান করে আসছে। বিশেষত, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি), ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের মতো অবকাঠামো প্রকল্পগুলো “বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি)” ধারণার আওতায় জাপানের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ। বিএনপির নতুন সরকারের সময়েও এসব প্রকল্পের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে সমর্থন দিতে জাপান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এছাড়া আমাদের দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জাপানি ভাষা শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে— এটি সত্যিই আনন্দের বিষয়। বাংলাদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষা ও জাপানি সংস্কৃতির প্রসার আরও জোরদারে জাপান তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
এই সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে পাশাপাশি, বাংলাদেশে অবস্থানরত জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দূতাবাসের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে। এ বছর ঢাকা সন্ত্রাসী হামলার (হোলি আর্টিসান হামলা) দশম বার্ষিকী। সেই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি যেন কখনও বিস্মৃত না হয়, সে লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ অঙ্গীকার নিয়ে জাপানি নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ বছরের মে মাসের শুরুতে ভিয়েতনামের হ্যানয় সফরকালে “আপডেটেড (হালনাগাদ) অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)” ধারণার ঘোষণা করেন। তিনি এমন একটি অঞ্চলের দূরদর্শি লক্ষ্য তুলে ধরেন, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সব দেশ “একসঙ্গে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ” হয়ে উঠবে। বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আঞ্চলিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাপানের কাছে বাংলাদেশ “এফওআইপি” বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। “আপডেটেড এফওআইপি”-এর অধীনে জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে এবং বাংলাদেশে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতাকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।
জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আপনাদের সবার সঙ্গে একযোগে কাজ করে দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
