ছয় দশকের রাজনীতির এক জীবন্ত অধ্যায়
ফেরদৌস আরেফীন
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
ছবি: তোফায়েল আহমেদ
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য নাম, যিনি তার দীর্ঘ ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নীতি-নির্ধারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বাণিজ্য, শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তার জীবন ও কর্ম যেন বাংলাদেশের রাজনীতির উত্থান-পতনের এক জীবন্ত দলিল।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর (মতান্তরে ১৯৩৯ সালে) তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার কোদালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম সোনা মিয়া কাজী এবং মাতা মরহুমা নূরজাহান বেগম। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় বিদ্যালয়ে। তিনি ভাঙ্গা পাইলট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়। ১৯৬০-এর দশকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও বাগ্মিতার জন্য নেতৃত্বের সারিতে উপরে উঠে আসেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।
তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। তার সময়কালে তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বিশেষ করে শিক্ষা আন্দোলন ও ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার পর তিনি অন্যান্য নেতাকর্মীদের সাথে ভারতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রচারকার্য চালানোর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতেও কাজ করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে মুজিবনগর সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়ে যান। এছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ রাজনীতির মূলধারায় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশ করেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ফরিদপুর-১৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে তিনি প্রথমে উপমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকেন এবং তৎকালীন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯০ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি প্রথমে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরে শিল্পমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ২০০৯ সালে গঠিত সরকারে তিনি শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং ২০১৯ সালে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে তিনি WTO (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা)-র নীতি নির্ধারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়।
তার সবচেয়ে বড় অর্জন দলের প্রতিটি ক্রান্তিকালে নীতির প্রতি অবিচল থাকা এবং জাতীয় স্বার্থে কাজ করা। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক সংকটে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রবীণ নেতা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে তার কিছু বক্তব্য সমালোচিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তোফায়েল আহমেদ এক পুত্র ও তিন কন্যার জনক। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করেননি; বরং দল থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে টানা ১২ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং ৬৪ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি সক্রিয় নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর তোফায়েল আহমেদ আত্মগোপনে চলে যান এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের শেষের দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।
তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যই নন; তিনি আওয়ামী লীগের একটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও দলের নীতি-নির্ধারণে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছেন। তার জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির এক উত্থান-পতনের জীবন্ত ইতিহাস, যা ভবিষ্যতের গবেষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে।
