×

মতামত

ঢাকার ভোটে দিল্লির হিসাব

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

ঢাকার ভোটে দিল্লির হিসাব

ছবি:রাসেল আহমদ

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পর। ঐতিহাসিক এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার রদবদলের ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক ধরনের রূপান্তরকালীন মুহূর্ত। এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিবেশী ভারতের যে গভীর মনোযোগ, উৎকণ্ঠা ও সতর্কতা,তা দিল্লির কৌশলগত চিন্তাভাবনার জগতে ব্যতিক্রমী হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ বাংলাদেশের আগামী কালের নির্বাচন এমন কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিতে যাচ্ছে, যা গত দেড় দশকের পরিচিত কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে এমন একটি সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যেখানে আওয়ামী লীগ থাকবে না। টানা বহু বছর ধরে ঢাকায় যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে দিল্লি কেবল অভ্যস্তই হয়ে ওঠেনি,বরং সেই বন্দোবস্তকে ঘিরেই ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কৌশল পরিকল্পিত হয়েছিল। সেই পরিচিত কাঠামোর অবসান মানে দিল্লির জন্য একটি ‘কমফোর্ট জোন’ ভেঙে যাওয়া। নতুন বাস্তবতায় ভারতকে আবার নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা। নির্বাচনী ফলাফল কি হবে? নতুন সরকার একক দলনির্ভর হবে, নাকি জোটনির্ভর? এই প্রশ্নটি ভারতের কাছে নিছক রাজনৈতিক কৌতূহলের বিষয় নয়। বিশেষ করে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে, না কি জামায়াতে ইসলামী সরকারে অংশীদার হবে-এই সম্ভাবনা দিল্লির কৌশলগত উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। 

অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জোট রাজনীতির সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি টানাপোড়েনপূর্ণ। যদিও সময় বদলেছে, আঞ্চলিক বাস্তবতা পাল্টেছে, তবু ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ইতিহাসকে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলে ধরে নিতে রাজি নন।

এখানেই জামায়াতে ইসলামীর প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকারে থাকুক বা শক্তিশালী বিরোধী দল হোক, নতুন সংসদে দলটির প্রভাব যে উল্লেখযোগ্য হবে, তা নিয়ে খুব একটা দ্বিমত নেই। 

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ভাবনায় জামায়াত ছিল এক ধরনের অঘোষিত সীমারেখা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দিল্লি সেই সীমারেখা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। আদর্শগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত বাস্তবতা ভারতকে বুঝিয়ে দিচ্ছে-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই শেষ পর্যন্ত নির্ধারক, নৈতিক পছন্দ নয়।

তবে এসব রাজনৈতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে ভারতের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা। এই প্রশ্নে দিল্লির অবস্থান বরাবরই কঠোর ও আপসহীন। বাংলাদেশের ভূখণ্ড যদি কোনোভাবেই উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়, সেটি ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই বার্তা ঢাকাকে বহুবার স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। বিগত দেড় দশকে এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সহযোগিতা দিল্লির জন্য বড় স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছিল। নতুন সরকার সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে কি না, সেটিই এখন ভারতের কৌশলগত দুশ্চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।

এই পটভূমিতেই এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভারতের ভূমিকা লক্ষণীয়ভাবে সংযত। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে ভারতের সক্রিয় বা অতিসক্রিয় ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, এবারে তার পুনরাবৃত্তি হয়নি। বরং প্রকাশ্যে দিল্লি নিজেদেরকে দূরত্ব বজায় রাখা এক পর্যবেক্ষক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এর পেছনে একটি বাস্তব উপলব্ধিও কাজ করছে। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে যে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল, তা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই দৃশ্যমান হস্তক্ষেপের বদলে নীরব কূটনীতি এবং বিকল্প যোগাযোগের পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।

এই সংযমের অর্থ এই নয় যে ভারতের কোনো রাজনৈতিক পছন্দ নেই। বরং দিল্লিতে একটি ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে,আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপি তুলনামূলকভাবে বেশি ‘প্রেডিক্টেবল’ ও ‘ম্যানেজেবল’ বিকল্প। যে দলটিকে একসময় ভারত-বিরোধী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, সেই দলের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। এমন ধারণাই এখন ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে আলোচিত। আঞ্চলিক বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা, জোট রাজনীতিতে কিছুটা সংযম এবং আন্তর্জাতিক চাপের প্রতি সচেতনতা,সব মিলিয়ে বিএনপি এখন আগের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে।

তবে ভারতের কৌশল কোনো একক দলের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেই দিল্লি এখন স্পষ্ট বার্তা দিতে চাচ্ছে-জনসমর্থনে নির্বাচিত যে কোনো সরকারের সঙ্গেই তারা কাজ করতে প্রস্তুত। এই বার্তার রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। এর মাধ্যমে ভারত বোঝাতে চাইছে, তারা আর কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘গ্যারান্টর’ হতে আগ্রহী নয়; বরং স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাই তাদের একমাত্র অগ্রাধিকার।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এই নির্বাচন ভারতের সামনে একাধিক অজানা সমীকরণ হাজির করেছে। কিন্তু এই অজানার মধ্যেও একটি বিষয় পরিষ্কার-দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন অনিশ্চয়তার চেয়ে নির্বাচন-পরবর্তী একটি স্থিতিশীল সরকারই এখন দিল্লির প্রধান চাওয়া। সেই সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রশ্নে ন্যূনতম সহযোগিতার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে আদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতের কোনো মৌলিক আপত্তি থাকবে না।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভোট শুধু ঢাকার ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি দিল্লির কৌশলগত মানচিত্রেও একটি বড় পরীক্ষা। কে ক্ষমতায় আসবে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে-নতুন সরকার আঞ্চলিক বাস্তবতাকে কতটা বোঝে এবং সেই বাস্তবতার সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে খাপ খাইয়ে নিতে কতটা প্রস্তুত। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই নির্বাচন তাই শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যতের অনেক হিসাব-নিকাশের সূচনাবিন্দু।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

টাইমলাইন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

তনু হত্যা মামলা সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’ পরিচালনায় সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার কাশেম

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

এক তরুণের কোমরে ৩ পিস্তল, গ্রেপ্তার করল পুলিশ

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অনুমোদনহীন খাদ্য উৎপাদন, দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App